‘ডান্ডাবেড়ি’ বিতর্কে উত্তাল রাজনৈতিক মহল: দেবপ্রিয়কে ঘিরে তীব্র সমালোচনায় এনসিপি নেতা

সংবাদের বিশেষ ডেস্ক: সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যকে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা সারোয়ার তুষার। তাঁর অভিযোগ, দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করতে ‘বৈধতা’র প্রশ্ন তুলে সরকারকে থামিয়ে দিতে চাইছেন।

মঙ্গলবার রাতে নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সারোয়ার তুষার লিখেছেন— দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য হচ্ছেন ইন্টেরিম সরকারের ঘরের শত্রু বিভীষণ। তাঁর ভাষায়, “এই সরকার যেন সংস্কারের পথে না যেতে পারে, সেজন্যই দেবপ্রিয় সাহেব ‘বৈধতা’র বিভ্রান্তিকর তত্ত্ব সামনে এনে সরকারকে ডান্ডাবেড়ি পরাতে চাইছেন।”

তুষার বলেন, দেবপ্রিয় মূলত বর্তমান সরকারের উপদেষ্টাদের এই বার্তা দিচ্ছেন যে, “সংস্কার না করে এক্সিট প্ল্যান করো, তোমাদের পদক্ষেপগুলো পরবর্তী সংসদে বৈধতা পাবে না।” এর ফলে সরকারের ভেতরে দ্বিধা ও আত্মবিশ্বাসের সংকট তৈরি হয়েছে বলেও দাবি তার।

তিনি আরও বলেন, “আমরা দেখছি, এই ধারার চিন্তাভাবনা সংস্কারের পথে এক ধরনের মানসিক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে। সরকার মনে করছে, পরবর্তী পার্লামেন্টে নেগোসিয়েশন না করে সংস্কার করলে লাভ নেই। এটা একপ্রকার আত্মসমর্পণ।”

‘বৈধতা’ প্রসঙ্গে হ্যান্স কেলসেনের যুক্তি টেনে ব্যাখ্যা

সারোয়ার তুষার দাবি করেন, বর্তমান সরকারের ‘বৈধতা’র জন্য ভবিষ্যৎ সংসদের ওপর নির্ভর করার প্রয়োজন নেই। তিনি আইনবিদ হ্যান্স কেলসেনের তত্ত্বের উদাহরণ টেনে বলেন, “ক্ষমতাই ক্ষমতার উৎস। কেউ যদি ক্ষমতায় থাকতে পারে, তবে সে নিজেই নিজের সাংবিধানিক ও আইনি বৈধতা তৈরি করতে পারে।”

তাঁর ভাষায়, “যেভাবে সামরিক সরকার ক্ষমতা দখল করে প্রোক্লেমেশন জারি করে নিজেদের বৈধতা নিজেরাই দেয়, সেভাবে এই সরকারও পারত বা পারে। অথচ গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আসা সরকারের জন্য নাকি ‘বৈধতা’ পরে নির্বাচিত সংসদ দেবে— এটা হাস্যকর!”

‘গণতান্ত্রিক সংস্কার রুখতেই এই ষড়যন্ত্র’

তুষারের ভাষ্য, বাংলাদেশের গভীর গণতান্ত্রিক সংস্কার যেন না হয়— সেই এজেন্ডাতেই কাজ করছেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য ও তাঁর মত ব্যক্তিরা। তিনি বলেন, “তাঁরা যখন নির্বাচনের কথা বলেন, তখন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নির্মাণ নয়, বরং নির্বাচনের মোড়কে স্ট্যাটাস-কো বজায় রাখার মতাদর্শ দাঁড় করান।”

এনসিপি নেতার অভিযোগ, “তাঁরা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র চান না; চান বিদ্যমান ফ্যাসিস্ট ও ঔপনিবেশিক কাঠামো বহাল থাকুক, শুধু উপরে কিছু কসমেটিকস সংস্কার হোক।”

সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপটে এই বিতর্ক কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

জুলাইয়ের গণজাগরণ এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কারমুখী পরিকল্পনাকে ঘিরে রাজনৈতিক ও চিন্তাবিদ মহলে যখন জোর আলোচনা চলছে, ঠিক তখনই সারোয়ার তুষারের এই বক্তব্য নতুন মাত্রা যোগ করলো। যদিও দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এই বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া দেননি, তবে তাঁর আগের বক্তৃতা ও লেখায় সংস্কার ও নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ ছিল লক্ষণীয়।

বিশ্লেষকদের মতে, এই বিতর্ক শুধু মতবিরোধ নয়, বরং অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতার কাঠামো ও ভবিষ্যৎ পথচলা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে।


প্রশ্ন রইলো— রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক মহলের ভেতরের এই মতপার্থক্য কি বাস্তব সংস্কারকে আটকে দিচ্ছে? নাকি এটি গণতন্ত্রের নামে বিদ্যমান ক্ষমতাকাঠামো রক্ষারই আরেক কৌশল?

Next News Previous News