কর্তৃত্ববাদী শাসন ও ব্যক্তিত্বের অর্চনা
এলাহী নেওয়াজ খান | প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৫, ০৯:৪৩
রাজনীতিতে ব্যক্তিপূজা বা ব্যক্তিত্বের অর্চনা নতুন কোনো বিষয় নয়। এটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেখা গেছে, যেখানে একজন নেতাকে দেবতুল্য করে উপস্থাপন করা হয়। মধ্যযুগের রাজতন্ত্র থেকে শুরু করে আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায়ও ব্যক্তিপূজার চর্চা বহুবার লক্ষ করা গেছে।
ব্যক্তিত্ব পূজার উৎস
প্রথমে ধর্মীয় অন্ধত্ব থেকে এর উত্থান হলেও পরবর্তীতে রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে। রোমান সম্রাট থেকে শুরু করে আধুনিক শাসকরা নিজেদের চারপাশে এক ধরনের কাল্টইজম গড়ে তোলেন। ইউরোপে গণতন্ত্রের বিকাশের কারণে এ ধারা দুর্বল হলেও এশিয়া ও অন্যান্য অঞ্চলে আজও ব্যক্তিপূজার সংস্কৃতি বিদ্যমান।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশে শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ হাসিনার শাসনামলকে কেন্দ্র করে ব্যক্তিত্বের অর্চনা বিশেষভাবে আলোচিত। ‘এক নেতা এক দেশ/বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ’ স্লোগানের মাধ্যমে শেখ মুজিবুর রহমানকে পূজিত করা হয়, যা শেষ পর্যন্ত একদলীয় শাসনের পথ তৈরি করে। তার কন্যা শেখ হাসিনা দীর্ঘ শাসনকালে একই ধারা অব্যাহত রাখেন এবং রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন করতে কঠোর অবস্থান নেন।
আন্তর্জাতিক তুলনা
উইকিপিডিয়ার তালিকায় দেখা যায়, ব্যক্তিত্ব পূজা গড়ে তুলেছেন মুসোলিনি, হিটলার, মাও সেতুং, কিম ইল সুং, মার্কোস, জুয়ান পেরনসহ নানা একনায়ক। বিশেষত আর্জেন্টিনার পেরনের শাসন ও শেখ হাসিনার শাসনের মধ্যে অদ্ভুত মিল লক্ষ্য করা যায়। উভয় ক্ষেত্রেই শিক্ষা ও গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ, বিরোধী মত দমন, এবং নেতার জীবনী প্রচার বাধ্যতামূলক করার মতো কর্মকাণ্ড দেখা গেছে।
কাল্টইজমের বৈশিষ্ট্য
- প্রশ্নাতীত আনুগত্য ও অন্ধ অনুসরণ
- বাস্তবতা অস্বীকার করে রাজনৈতিক ন্যারেটিভ তৈরি
- মিথ্যা তথ্য ও ষড়যন্ত্রতত্ত্ব প্রচার
- প্রতিবাদী কণ্ঠ স্তব্ধ করা
- মিডিয়ার ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ
ঐতিহাসিক শিক্ষা
ইতিহাসে বহু নেতা প্রথম জীবনে নায়ক হিসেবে আবির্ভূত হলেও পরবর্তীতে ভিলেনে পরিণত হয়েছেন। যেমন, ফ্রান্সের জেনারেল ফিলিপ প্যাটেন, যিনি প্রথম মহাযুদ্ধে বীর হলেও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে জার্মানির সহযোগী হয়ে শেষমেশ কারাগারে মৃত্যুবরণ করেন।
এই অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে ব্যক্তিত্বের অর্চনা যতই শক্তিশালী মনে হোক না কেন, সময়ের পরিক্রমায় তা ভেঙে যায়। কিন্তু ইতিহাস কখনোই এসব নেতার নাম ভুলে যায় না—তা নায়ক হোক বা ভিলেন।
