কোটা নিয়ে উত্তাল দেশ, ইতিহাস গড়ল ছাত্র-জনতার আন্দোলন

২০১৮ সালে কোটা বাতিলের সিদ্ধান্ত থেকে শুরু করে ২০২৫ সালের অভাবনীয় রাজনৈতিক রদবদল—বাংলাদেশ এখন একটি নতুন অধ্যায়ের মুখোমুখি।

সবকিছু শুরু হয়েছিল ২০১৮ সালে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের চাপে সরকার প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে সব কোটা বাতিল করে। পরবর্তীতে ২০২১ সালে একদল মুক্তিযোদ্ধার সন্তান সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করে। প্রায় তিন বছর পর, ২০২৪ সালের ৫ জুন হাইকোর্ট কোটা বাতিলের সিদ্ধান্তকে অবৈধ ঘোষণা করে নতুন পরিপত্র জারির নির্দেশ দেয়।

এই রায়ের প্রেক্ষিতে ফের রাস্তায় নামে শিক্ষার্থীরা। ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ ব্যানারে তারা দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ শুরু করে। চার দফা দাবি থেকে আন্দোলন এক দফায় গড়ায়—সব ধরনের অযৌক্তিক কোটা বাতিল করে সংবিধান অনুযায়ী অনগ্রসর গোষ্ঠীর জন্য ন্যূনতম কোটা নিশ্চিতের দাবি ওঠে।

আন্দোলনের চাপে রাষ্ট্রপক্ষ শুরুতে নীরব থাকলেও পরে ১০ জুলাই আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায়ের ওপর চার সপ্তাহের জন্য স্থিতাবস্থা জারি করে।

১৪ জুলাই, এক সংবাদ সম্মেলনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বলেন, “সরকারি চাকরিতে কোটার বিষয়টি আদালতেই ফয়সালা করতে হবে।” তবে একই সময় দেওয়া তাঁর ‘রাজাকার’ মন্তব্য আন্দোলনে উত্তেজনা বাড়িয়ে তোলে। পরদিন ছাত্রলীগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালায়।

১৬ জুলাই ঘটে ভয়াবহ সহিংসতা—পুলিশ ও ছাত্রলীগের হামলায় প্রাণ হারান ৬ শিক্ষার্থী। সরকার দেশজুড়ে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করে। শেখ হাসিনা জাতির উদ্দেশে ভাষণে বলেন, “আমি বিশ্বাস করি কোটা সংস্কার আন্দোলনের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের সঙ্গে সন্ত্রাসীদের কোনো সম্পর্ক নেই।”

কিন্তু এই বক্তব্যেও উত্তাল জনতা থামেনি। ১৮ জুলাই ঘোষণা আসে ‘শাটডাউনের’। সারাদেশ কার্যত অচল হয়ে পড়ে। প্রাণ যায় আরও ৪১ জনের।

আইনমন্ত্রী জানান, “আন্দোলনকারীরা চাইলে, সরকার আলোচনায় বসতে প্রস্তুত।” তিনি আরও জানান, আপিল শুনানির দিন ২১ জুলাই এগিয়ে আনা হয়েছে এবং বিচারবিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠনের অনুরোধ জানানো হবে।

তবে পরিস্থিতির অবনতি অব্যাহত থাকায় সরকার ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয় এবং রাত ১২টা থেকে দেশজুড়ে কারফিউ জারি করে। সেনাবাহিনী নামে রাস্তায়।

শেষ পর্যন্ত ২১ জুলাই, আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় বাতিল করে একটি নতুন কোটা বিন্যাস নির্ধারণ করে দেয়। রায়ে বলা হয়—মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের জন্য ৫ শতাংশ, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য ১ শতাংশ, এবং প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের জন্য ১ শতাংশ কোটা সংরক্ষিত থাকবে। বাকি ৯৩ শতাংশ পদ মেধাভিত্তিতে পূরণ হবে।

এই রায় কার্যকর করতে সরকার অবিলম্বে গেজেট প্রকাশের নির্দেশ পায়।

এই ঘটনাপ্রবাহের দুই সপ্তাহ পর, ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকার পদত্যাগে বাধ্য হয়। ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয় একজন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অর্থনীতিবিদের নেতৃত্বে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি এক অনন্য মোড়—যেখানে একটি শিক্ষার্থী আন্দোলন বদলে দিয়েছে একটি দীর্ঘস্থায়ী শাসনব্যবস্থার ধারা।

আপনার কী মনে হয়—এই কোটা আন্দোলন কি কেবলই চাকরির ন্যায্যতার দাবি, নাকি এটি ছিল তরুণ সমাজের বৃহত্তর অধিকার ও প্রতিনিধিত্বের লড়াই?

Next News Previous News