মিটফোর্ডে চিকিৎসকদের ওপর হামলার অভিযোগ, কর্মবিরতিতে ইন্টার্নরা
রাজধানীর স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ (এসএসএমসি) ও মিটফোর্ড হাসপাতালে চিকিৎসকদের ওপর হামলার অভিযোগকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। রোগীর স্বজনদের সঙ্গে চিকিৎসকদের সংঘর্ষের ঘটনায় হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসকরা চার দফা দাবি তুলে কর্মবিরতি শুরু করেছেন। একই সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে তারা।
মঙ্গলবার রাতে হাসপাতালের সার্জারি বিভাগে ঘটে যাওয়া এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে চিকিৎসক সমাজে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। চিকিৎসকদের অভিযোগ, রোগী ভর্তির প্রক্রিয়া নিয়ে শুরু হওয়া বাকবিতণ্ডা একপর্যায়ে শারীরিক হামলায় রূপ নেয়। অন্যদিকে অভিযুক্ত পক্ষের দাবি, ঘটনাটি একতরফাভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে এবং তাদের পক্ষের লোকজনও আহত হয়েছেন।
যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, অসুস্থ এক রোগীকে চিকিৎসার জন্য মিটফোর্ড হাসপাতালে আনা হলে ভর্তি ও আনুষঙ্গিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে কিছুটা সময় লাগে। এ সময় রোগীর স্বজনদের সঙ্গে দায়িত্বরত চিকিৎসকদের কথা কাটাকাটি শুরু হয়। পরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে সংঘর্ষে রূপ নেয়।
এসএসএমসি মিটফোর্ড হাসপাতাল ইন্টার্ন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশনের (আইডিএ) দাবি, ১০ থেকে ১২ জন ব্যক্তি সার্জারি ভবনের একটি কক্ষে প্রবেশ করে চিকিৎসকদের শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত ও মারধর করেন। সংগঠনটি ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে।
হামলার অভিযোগে ছাত্রনেতার নাম, পাল্টা বক্তব্যও রয়েছে
ঘটনার পর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের আহ্বায়ক মেহেদী হাসান হিমেলের নাম আলোচনায় আসে। কয়েকজন চিকিৎসক দাবি করেন, ঘটনার সময় তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন এবং নিজের পরিচয়ও দিয়েছেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে কাউকে শনাক্ত করতে পারেনি।
ইন্টার্ন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা জানিয়েছেন, ঘটনার স্থানে কার্যকর সিসিটিভি ফুটেজ না থাকায় সংশ্লিষ্টদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই তারা দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের আহ্বান জানিয়েছেন।
অন্যদিকে মেহেদী হাসান হিমেল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ঘটনাটি বিভিন্ন মাধ্যমে যেভাবে প্রচার করা হচ্ছে বাস্তব পরিস্থিতি তার সঙ্গে পুরোপুরি মিল নেই। তার দাবি, বিষয়টি ইতোমধ্যে মীমাংসার পর্যায়ে এসেছে।
আহতের দাবি দুই পক্ষেরই
চিকিৎসকদের পাশাপাশি হিমেল ও তার সঙ্গে থাকা কয়েকজনও আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার পর তারা রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থীও দাবি করেছেন, হিমেলের শরীরে আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে।
এ কারণে ঘটনাটিকে ঘিরে দুই পক্ষের বক্তব্যে ভিন্নতা দেখা দিয়েছে। ফলে প্রকৃত পরিস্থিতি নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি আরও জোরালো হয়েছে।
চার দফা দাবিতে কর্মবিরতি
ঘটনার প্রতিবাদে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা চার দফা দাবি ঘোষণা করেছেন। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে হাসপাতালের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ওয়ার্ডে পুলিশ সদস্য মোতায়েন, গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, হামলার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও বিচারের আওতায় আনা এবং দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তাকর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ।
ইন্টার্ন চিকিৎসকদের ভাষ্য, দাবি বাস্তবায়নের বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়া পর্যন্ত তাদের কর্মসূচি চলবে। এর ফলে হাসপাতালের স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা কিছুটা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পুলিশের অবস্থান
কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহ মো. ফয়সাল আহমেদ জানিয়েছেন, ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশের একাধিক দল দ্রুত হাসপাতালে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষের কাছ থেকে লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন
মিটফোর্ড হাসপাতালের এই ঘটনা সরকারি হাসপাতালগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। চিকিৎসক সংগঠনগুলোর মতে, কর্মস্থলে নিরাপত্তাহীনতা বাড়তে থাকলে চিকিৎসাসেবার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অন্যদিকে রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঘটনার তদন্ত ও পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে এখন নজর চিকিৎসক সমাজ, শিক্ষার্থী মহল এবং সাধারণ মানুষের।
সূত্র: আমার দেশ-এর প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রস্তুত।
