নতুন-পুরাতন বুঝি না, যেখানেই ফ্যাসিবাদ সেখানেই প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ: ডা. শফিক
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার অধিবেশনে দলের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, দেশে যেখানেই ফ্যাসিবাদ, স্বৈরাচার বা গণতন্ত্রবিরোধী প্রবণতা দেখা যাবে, সেখানেই প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে। তিনি বলেন, নতুন বা পুরাতন—কোনো ধরনের ফ্যাসিবাদই গ্রহণযোগ্য নয় এবং জনগণের অধিকার রক্ষায় দল আপসহীন থাকবে।
রাজধানীর আল ফালাহ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এই অধিবেশনে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ, নির্বাহী পরিষদ, কর্মপরিষদ এবং কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার সদস্যরা অংশ নেন। সভায় দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সংস্কার প্রক্রিয়া, গণতন্ত্র, নির্বাচন এবং জাতীয় নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন বিষয় উঠে আসে।
গণভোট ও সংস্কার বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন
উদ্বোধনী বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান দাবি করেন, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচন ও সংস্কার-সংক্রান্ত গণভোটে জনগণ একাধিক বিষয়ে মতামত দিলেও তার সবকটির যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি। তার মতে, জনগণের একটি বড় অংশের মতামত উপেক্ষিত হওয়ায় প্রত্যাশিত পরিবর্তন বাস্তবায়িত হয়নি।
তিনি বলেন, জনগণ রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহিতা ও মৌলিক সংস্কার চাইলেও সংশ্লিষ্ট অনেক বিষয় এখনও বাস্তবায়নের বাইরে রয়েছে। বিশেষ করে স্বাধীন বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন ও মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন তিনি।
রাজনৈতিক ঐকমত্য ও জনগণের প্রত্যাশা
জামায়াত আমিরের ভাষ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে যে সংস্কার কাঠামো প্রণয়ন করা হয়েছিল, তার পূর্ণ বাস্তবায়ন না হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, জনগণের রায়কে গুরুত্ব না দিলে গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ন্যায্য অধিকার আদায়ে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে এবং গণতান্ত্রিক উপায়ে আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে।
সীমান্ত ও জাতীয় নিরাপত্তা প্রসঙ্গ
সাম্প্রতিক সীমান্ত পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান প্রয়োজন। তিনি সীমান্ত নিরাপত্তা রক্ষায় দায়িত্ব পালনকারী বাহিনীর প্রতি সমর্থন জানান এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সর্বস্তরের জনগণের ঐক্যের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তার মতে, জাতীয় নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে ন্যূনতম সমন্বয় থাকা জরুরি।
শিক্ষা, নৈতিকতা ও রাষ্ট্র পরিচালনা
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশের বিপুল জনসংখ্যাকে এখনও কাঙ্ক্ষিতভাবে মানবসম্পদে রূপান্তর করা যায়নি। তিনি সুশিক্ষা, নৈতিক মূল্যবোধ এবং দক্ষ জনশক্তি গঠনের ওপর জোর দেন।
তার মতে, রাষ্ট্র পরিচালনায় সততা ও জবাবদিহিতার অভাব থাকলে দুর্নীতি ও অনিয়ম বৃদ্ধি পায়। তাই দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন প্রয়োজন।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন জামায়াত আমির। তিনি শিশু নির্যাতন, হত্যাকাণ্ড এবং রাজনৈতিক সহিংসতার বিভিন্ন ঘটনার দ্রুত তদন্ত ও বিচার দাবি করেন। পাশাপাশি জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আরও কার্যকর ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, একটি নিরাপদ সমাজ গঠনের জন্য অপরাধ দমনের পাশাপাশি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সংসদে গঠনমূলক বিরোধিতার বার্তা
সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা সম্পর্কে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জনকল্যাণমূলক উদ্যোগে সরকারকে সহযোগিতা করা হবে। তবে জনগণের স্বার্থবিরোধী বা গণতন্ত্রবিরোধী কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে সংসদের ভেতরে ও বাইরে গণতান্ত্রিক উপায়ে বিরোধিতা অব্যাহত থাকবে।
তিনি আরও বলেন, ক্ষমতার ভারসাম্য, জবাবদিহিতা এবং মৌলিক সংস্কার নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা প্রতিরোধ করা সহজ হবে।
বক্তব্যের শেষাংশে তিনি একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও নিরাপদ বাংলাদেশ গঠার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে শিশু, নারী এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কাজ করে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
সূত্র: আমার দেশ-এর প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রস্তুত।
