সরকার অতীত থেকে শিক্ষা নেয়নি, সকলের জন্য অশনি সংকেত: বদিউল আলম

বর্তমান সরকার অতীতের রাজনৈতিক ও বিচারিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় তিনি বলেন, সাম্প্রতিক কিছু আইন ও অধ্যাদেশ বাতিলের সিদ্ধান্ত শুধু নাগরিকদের জন্য নয়, ক্ষমতাসীনদের জন্যও ভবিষ্যতে ঝুঁকির কারণ হতে পারে।

বিচার বিভাগ নিয়ে উদ্বেগ

‘মানবাধিকার সুরক্ষা ও স্বাধীন বিচার বিভাগ সম্পর্কিত অধ্যাদেশসমূহের বিষয়ে নাগরিক ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক আলোচনায় ড. মজুমদার উচ্চ আদালতের বিচারক নিয়োগ এবং বিচার বিভাগের সচিবালয় সংক্রান্ত দুটি অধ্যাদেশ রহিত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তার মতে, এই সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা স্পষ্ট নয় এবং এটি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে।

তিনি অতীত অভিজ্ঞতার উদাহরণ টেনে বলেন, ২০১৮ সালে উচ্চ আদালতে বিপুল সংখ্যক রাজনৈতিক নেতাকর্মী আইনি সুরক্ষার আশায় গেলেও অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর প্রতিকার পাননি। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে বর্তমান সিদ্ধান্তকে তিনি উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেন।

‘শপথপ্রাপ্ত বিচারপতি’ প্রসঙ্গ

ড. বদিউল আলম প্রশ্ন তোলেন, সরকার কি আবারও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত বিচারপতি নিয়োগের পথে হাঁটছে। তার মতে, যদি বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক প্রভাবের আওতায় আনা হয়, তবে তা শুধু বিরোধী পক্ষ নয়, সমাজের সব স্তরের মানুষের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের জন্য হুমকি হয়ে উঠবে।

তিনি বলেন, “এই পথে হাঁটতে থাকলে আমাদের কারও অস্তিত্বই নিরাপদ থাকবে না।”

আইন প্রণয়নে দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গির আহ্বান

ক্ষমতাসীনদের উদ্দেশে তিনি বলেন, এমন আইন প্রণয়ন করা উচিত যা তারা ক্ষমতার বাইরে থাকলেও তাদের সুরক্ষা দেবে। তার মতে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আইন কখনোই তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক সুবিধার জন্য তৈরি হওয়া উচিত নয়।

গণভোট নিয়ে অনীহা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিতকারী গুরুত্বপূর্ণ আইন বাতিলের প্রবণতাও তিনি সমালোচনা করেন। এতে নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা কমতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ‘অভিশাপ’

ড. মজুমদার রাজনৈতিক ইতিহাসের উদাহরণ টেনে বলেন, ১৯৭৩, ২০০১ এবং ২০০৮ সালের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে অতিরিক্ত সংখ্যাগরিষ্ঠতা অনেক সময় স্বৈরাচারী প্রবণতা তৈরি করে। তিনি এটিকে “দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার অভিশাপ” হিসেবে উল্লেখ করেন।

তার মতে, এ ধরনের পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর ও গণতান্ত্রিক ভারসাম্যকে দুর্বল করে।

নাগরিক সমাজের উদ্বেগ

গোলটেবিল আলোচনায় বিচার বিভাগ, মানবাধিকার এবং আইনের শাসন নিয়ে নাগরিক সমাজের আরও বেশ কয়েকজন প্রতিনিধি বক্তব্য দেন। আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন।

উপসংহার

ড. বদিউল আলম মজুমদারের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে যে বর্তমান আইন ও অধ্যাদেশ সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলো শুধু তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক ইস্যু নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামো এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। এখন দেখার বিষয়, সরকার এই সমালোচনার জবাবে কী ধরনের নীতিগত অবস্থান নেয়।

Source: Based on reporting from the Staff Reporter and statements made at the roundtable discussion organized by HRSS at the National Press Club.

Next News Previous News