সরকার শুধু নোট অব ডিসেন্টকে অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে চায়’
জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ সংক্রান্ত বিল নিয়ে তীব্র আপত্তি জানিয়েছেন রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর সদস্য সচিব আখতার হোসেন। বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামানের উত্থাপিত সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ রহিতকরণ বিল-২০২৬ নিয়ে আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি অভিযোগ করেন, সরকার জুলাই সনদের মূল ভাষ্যের পরিবর্তে শুধু ‘নোট অব ডিসেন্ট’ অংশটিকেই অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করতে চাইছে। তার এই বক্তব্য সংসদে নতুন রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
জুলাই সনদ নিয়ে সরকারের অবস্থান প্রশ্নে
আখতার হোসেন বলেন, সরকারদল প্রায়ই জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কথা বললেও বাস্তবে তারা কেবল নোট অব ডিসেন্ট বা সংখ্যালঘু মতামতের অংশটিকেই গুরুত্ব দিচ্ছে। তার ভাষায়, জুলাই সনদের দুটি অংশ রয়েছে—একটি মূল ভাষ্য এবং অন্যটি নোট অব ডিসেন্ট। তিনি দাবি করেন, সরকারের বক্তব্য ও আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় মূল সনদের চেয়ে ভিন্নমত বা ডিসেন্ট অংশটিকেই বেশি প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।
এই মন্তব্য আসে এমন এক সময়ে, যখন জুলাই সনদের ব্যাখ্যা ও বাস্তবায়ন নিয়ে সংসদে সরকার ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক তীব্র হয়েছে।
বিচারপতি নিয়োগে সাংবিধানিক ব্যাখ্যা
সংসদে দেওয়া বক্তব্যে তিনি সংবিধানের ৯৫ ও ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ উল্লেখ করে বিচারপতি নিয়োগের প্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন। তার মতে, সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতির পরামর্শক্রমে বিচারপতি নিয়োগের কথা বলা হলেও ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বাস্তবে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়া রাষ্ট্রপতির পক্ষে তা কার্যকর করা সম্ভব নয়।
আখতার হোসেন বলেন, এই কাঠামোর কারণে অতীতে রাজনৈতিক বিবেচনায় বিচারপতি নিয়োগের নজির তৈরি হয়েছিল। তিনি দাবি করেন, বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থাকে আবার সেই ধরনের রাজনৈতিক প্রভাবের মধ্যে ফিরিয়ে নেওয়া উচিত হবে না।
বিচারপতি নিয়োগে আইনের প্রয়োজনীয়তা
এনসিপির এই নেতা আরও বলেন, সংবিধান সরকারকে বিচারপতি নিয়োগের জন্য আলাদা আইন করার সুযোগ দিয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, বিচারপতি নিয়োগে মূলত তিনটি শর্ত রয়েছে—বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে, হাইকোর্টে কমপক্ষে ১০ বছরের প্র্যাকটিস থাকতে হবে অথবা বিচার বিভাগে ১০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।
তার মতে, এসব শর্ত স্পষ্টভাবে আইনে নির্ধারণ করে একটি স্বচ্ছ ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নিয়োগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও গুরুত্ব
বিশ্লেষকদের মতে, বিচারপতি নিয়োগ নিয়ে এই বিতর্ক বাংলাদেশের বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং সাংবিধানিক ভারসাম্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগের প্রভাব থেকে কতটা মুক্ত রাখা যায়, তা দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর একটি বড় সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়।
জুলাই সনদের ব্যাখ্যা নিয়ে এই মতপার্থক্য ভবিষ্যতে সংসদে আরও বিস্তৃত আলোচনার পথ তৈরি করতে পারে।
উপসংহার
আখতার হোসেনের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে যে, বিচারপতি নিয়োগ এবং জুলাই সনদের বাস্তবায়ন—দুই ইস্যুই এখন জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। এখন দেখার বিষয়, সরকার এই সমালোচনার জবাবে বিলের ভাষা বা কাঠামোয় কোনো পরিবর্তন আনে কি না।
Source: Based on reporting from যুগান্তর and proceedings of the National Parliament session.
