শ্রমিকদল নেতা মাসুম হত্যায় অংশ নেয় সন্ত্রাসীদের তিনটি গ্রুপ, আটক ২
খুলনায় রূপসা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি ও উপজেলা শ্রমিক দলের সাবেক আহ্বায়ক মাসুম বিল্লা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নতুন তথ্য দিয়েছে পুলিশ। তাদের মতে, পূর্ব শত্রুতা ও এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘটিত এ হত্যাকাণ্ডে সন্ত্রাসীদের অন্তত তিনটি আলাদা গ্রুপ অংশ নেয়। ইতোমধ্যে ঘটনায় জড়িত সন্দেহে দুইজনকে আটক করা হয়েছে এবং অন্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
পুলিশ জানায়, বুধবার রাতে খুলনা নগরীর ব্যস্ত ডাকবাংলা মোড়ে একটি জুতার শোরুমের ভেতরে ঢুকে ধারালো অস্ত্র ও গুলিতে মাসুম বিল্লাকে হত্যা করা হয়। ঘটনাটি নগরবাসীর মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে এবং রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনা শুরু হয়েছে।
তিনটি গ্রুপে বিভক্ত ছিল হামলাকারীরা
খুলনা মহানগর পুলিশের (কেএমপি) উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) মোহাম্মাদ তাজুল ইসলাম জানান, হত্যাকাণ্ডটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত। তদন্তে জানা গেছে, হামলায় মোট আটজন সদস্য অংশ নেয় এবং তাদের কাজ ভাগ করে দেওয়া ছিল তিনটি পৃথক গ্রুপে।
একটি গ্রুপ মাসুম বিল্লার চলাফেরা ও অবস্থান সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে অন্যদের কাছে পৌঁছে দিত। দ্বিতীয় গ্রুপটি হামলার পর সদস্যদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার দায়িত্বে ছিল। আর তৃতীয় গ্রুপ সরাসরি হামলা চালিয়ে হত্যার মিশন সম্পন্ন করে।
তিনি বলেন, সন্ত্রাসীরা প্রথমে নগরীর গল্লামারি এলাকা থেকে ময়লাপোতা মোড়ে জড়ো হয়। সেখান থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করে ডাকবাংলা মোড়ে অবস্থান নেয়। পরে মাসুম বিল্লা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কেনাকাটার জন্য সেখানে এলে তাকে লক্ষ্য করে ধাওয়া দেওয়া হয়।
শোরুমে ঢুকে হামলা
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, হামলাকারীদের ধাওয়া খেয়ে মাসুম বিল্লা ডাকবাংলা মোড়ে একটি জুতার শোরুমে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু সন্ত্রাসীরা তাকে অনুসরণ করে ভেতরে ঢুকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করে। এরপর দুই হামলাকারী তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। ঘটনাস্থলেই গুরুতর আহত হন তিনি।
স্থানীয়রা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করলেও তার আগেই তিনি মারা যান বলে পুলিশ জানিয়েছে।
আটক দুইজন, চলছে অভিযান
হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে প্রথমে অশোক ঘোষ নামে একজনকে আটক করে পুলিশ। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরে নগরীর সোনাডাঙ্গা ট্রাক টার্মিনাল এলাকার একটি ভবনের পাশ থেকে মো. জাবেদ গাজী নামে আরেকজনকে আটক করা হয়। জাবেদ ওই এলাকার বাসিন্দা আশরাফ আলীর ছেলে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, জাবেদ হামলার সময় ব্যাকআপ টিমে ছিল এবং হামলাকারীদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার কাজে যুক্ত ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। আটক দুইজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে।
চুক্তিভিত্তিক হত্যার অভিযোগ
খুলনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কবির হোসেন বলেন, আটক অশোক ঘোষের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, তিনি একজন কনট্রাক্ট কিলার এবং এই হত্যাকাণ্ডের জন্য ৫০ হাজার টাকায় চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন।
পুলিশ জানায়, হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধারের জন্যও অভিযান চলছে। আটক অশোককে আদালতে হাজির করে রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে।
দাফনের আগে জানাজায় রাজনৈতিক নেতারা
বৃহস্পতিবার দুপুরে ময়নাতদন্ত শেষে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে মাসুম বিল্লার মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে আছরের নামাজের পর স্থানীয় দারুস সালাম মসজিদ প্রাঙ্গণে জানাজা অনুষ্ঠিত হয় এবং পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
জানাজায় স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। উপস্থিত ছিলেন খুলনা-৪ আসনের সংসদ সদস্য আজিজুল বারী হেলাল, কেসিসি প্রশাসক ও খুলনা-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম মঞ্জু, খুলনা মহানগর বিএনপির সভাপতি শফিকুল আলম মনা এবং জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মো. মনিরুজ্জামান মন্টুসহ অন্য নেতারা।
তদন্তে আরও তথ্য মিলতে পারে
পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হামলাকারীদের অধিকাংশের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে এবং তাদের গ্রেপ্তারে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চলছে। তদন্ত শেষ হলে হত্যার প্রকৃত উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনার বিস্তারিত তথ্য সামনে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
Source: Based on reporting from Jugantor
