খালিদ প্রসঙ্গে মামদানিকে নিজের চরকায় তেল দেওয়ার আহ্বান ভারতের
কারাবন্দি ভারতীয় ছাত্রনেতা উমর খালিদকে সমর্থন জানিয়ে লেখা একটি ব্যক্তিগত চিঠি প্রকাশ্যে আসার পর যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সিটি কাউন্সিলের সদস্য জোহরান মামদানির বিরুদ্ধে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ভারত সরকার। নয়াদিল্লি স্পষ্ট ভাষায় বলেছে, বিদেশি জনপ্রতিনিধিদের উচিত অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিচারিক বিষয়ে মন্তব্য না করে নিজেদের দায়িত্বে মনোযোগ দেওয়া।
এই ঘটনায় আবারও আলোচনায় এসেছে উমর খালিদের দীর্ঘ কারাবাস, ভারতের বিচারিক প্রক্রিয়া এবং মানবাধিকার প্রশ্ন—যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নজর কাড়ছে।
চিঠি প্রকাশ ও সরকারের প্রতিক্রিয়া
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বলেন, নিউইয়র্কের একজন জনপ্রতিনিধির কাছ থেকে এমন মন্তব্য প্রত্যাশিত নয়। তাঁর ভাষায়, “আমরা আশা করি জনপ্রতিনিধিরা অন্য দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রতি সম্মান দেখাবেন।”
তিনি আরও যোগ করেন, দায়িত্বশীল পদে থাকা ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত পক্ষপাত প্রকাশ করা শোভন নয় এবং এটি কূটনৈতিক সৌজন্যের পরিপন্থী। এই বক্তব্যের মাধ্যমে ভারত কার্যত মামদানিকে ‘নিজের চরকায় তেল দেওয়ার’ পরামর্শ দিয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
মামদানির চিঠির প্রেক্ষাপট
জোহরান মামদানি গত বছরের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র সফররত উমর খালিদের বাবা-মায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এরপর তিনি খালিদকে একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু আবেগঘন চিঠি লেখেন। সম্প্রতি খালিদের পরিবার সেই চিঠি প্রকাশ করলে এক্স (সাবেক টুইটার) ও ইনস্টাগ্রামে তা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
চিঠিতে মামদানি লেখেন, “প্রিয় উমর, তিক্ততা নিয়ে তোমার কথাগুলো আমি বারবার ভাবি। তোমার বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করে ভালো লেগেছে। আমরা সবাই তোমার কথা ভাবছি।” চিঠিটির ভাষা রাজনৈতিক না হলেও প্রতীকী সমর্থন হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
উমর খালিদ মামলা ও আইনি অবস্থা
উমর খালিদ ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে সংঘটিত দিল্লি দাঙ্গার ঘটনায় অভিযুক্ত হন। সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর থেকে তিনি বিচার ছাড়াই কারাগারে রয়েছেন।
ভারতের সুপ্রিম কোর্ট চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি উমর খালিদ ও আরেক অভিযুক্ত শারজিল ইমামের জামিন আবেদন খারিজ করে দেন। আদালতের এই সিদ্ধান্ত মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার উদ্বেগ
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা কমিশন (USCIRF) উমর খালিদকে ধর্মীয় স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেওয়ার কারণে ‘নির্যাতিত ব্যক্তি’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে এই মামলাকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে আখ্যা দিয়ে আসছে।
মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই চিঠিকে কেন্দ্র করে ভারতের প্রতিক্রিয়া দেখায় যে সরকার আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মামলাটি নিয়ে বাড়তি নজরদারিকে অস্বস্তিকর মনে করছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তাৎপর্য
বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দক্ষিণ এশিয়ায় নাগরিক অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং বিচারিক স্বচ্ছতা নিয়ে আঞ্চলিক আলোচনা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও মানবাধিকার পরিস্থিতি প্রতিবেশী দেশগুলোর গণতান্ত্রিক চর্চার ওপরও পরোক্ষ প্রভাব ফেলে।
উপসংহার
উমর খালিদকে লেখা একটি ব্যক্তিগত চিঠি কীভাবে কূটনৈতিক বার্তা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিতে পারে, এই ঘটনা তারই উদাহরণ। এতে একদিকে যেমন ভারতের বিচারিক স্বাধীনতার প্রশ্ন উঠে এসেছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মানবাধিকার নিয়ে সংবেদনশীলতার বিষয়টিও নতুন করে সামনে এসেছে।
Source: Based on reporting from Middle East Eye and statements from India’s Ministry of External Affairs, as cited by My Country Online (আমার দেশ অনলাইন)।
