যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ইরান, যুক্তরাষ্ট্রকে হুঁশিয়ারি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা নতুন করে তীব্র আকার ধারণ করেছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করে বলেছেন, ওয়াশিংটন যদি সামরিক শক্তি ‘পরীক্ষা’ করার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে তেহরান যুদ্ধের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে। ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ও তা দমনে কঠোর অভিযানের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হুমকির পর এই মন্তব্য করেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের হুমকির জবাবে ইরানের অবস্থান

সোমবার আল জাজিরা আরবিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আব্বাস আরাগচি বলেন, অস্থির পরিস্থিতির মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগের কিছু চ্যানেল এখনো খোলা আছে। তবে তিনি জোর দিয়ে জানান, যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইরান প্রস্তুত এবং সামরিক সক্ষমতার দিক থেকে দেশটি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।

তার ভাষায়, গত বছরের ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘটিত ১২ দিনের যুদ্ধের পর ইরানের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি আরও বিস্তৃত ও সংগঠিত হয়েছে। তিনি বলেন, “ওয়াশিংটন যদি সামরিক বিকল্প পরীক্ষা করতে চায়, আগেও তারা তা করেছে। আমরাও প্রস্তুত আছি।”

বিক্ষোভ, ট্রাম্পের মন্তব্য ও সামরিক বিকল্প

ইরানে অর্থনৈতিক সংকট থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ ধীরে ধীরে রাজনৈতিক পরিবর্তনের দাবিতে রূপ নেয়। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রোববার বলেন, বিক্ষোভ দমনে ইরানি সরকারের পদক্ষেপের কারণে যুক্তরাষ্ট্র ‘কঠোর বিকল্প’ বিবেচনা করছে, যার মধ্যে সামরিক পদক্ষেপও থাকতে পারে।

এর জবাবে আরাগচি আশা প্রকাশ করেন, যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত সংলাপের “বুদ্ধিমান পথ” বেছে নেবে। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, কিছু পক্ষ ইসরায়েলের স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর চেষ্টা করছে।

হতাহত ও তথ্যপ্রবাহ নিয়ে ভিন্ন দাবি

সাক্ষাৎকারে সাম্প্রতিক সহিংসতায় হতাহতের বিষয়েও কথা বলেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তার দাবি, বিক্ষোভকারীদের মধ্যে ‘সন্ত্রাসী উপাদান’ ঢুকে নিরাপত্তা বাহিনী ও সাধারণ মানুষের ওপর হামলা চালিয়েছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সহিংসতায় শতাধিক নিরাপত্তাকর্মী নিহত হয়েছেন।

অন্যদিকে বিরোধী কর্মীরা বলছেন, নিহতের সংখ্যা আরও বেশি এবং এর মধ্যে শত শত বিক্ষোভকারী রয়েছেন। তবে ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। নেটব্লকসের তথ্য অনুযায়ী, দেশটি টানা ৯৬ ঘণ্টার বেশি সময় কার্যত অফলাইনে ছিল।

ইন্টারনেট ও কূটনৈতিক যোগাযোগ

ইন্টারনেট বন্ধের বিষয়ে আরাগচি জানান, নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে ধাপে ধাপে ইন্টারনেট সেবা পুনরায় চালু করা হবে। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে তার যোগাযোগ বিক্ষোভের আগে ও পরেও অব্যাহত রয়েছে।

তবে তিনি মন্তব্য করেন, যুক্তরাষ্ট্রের কিছু প্রস্তাব ও হুমকি ইরানের অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আরাগচির ভাষায়, “হুমকি বা চাপ ছাড়া হলে আমরা পরমাণু আলোচনার টেবিলে বসতে প্রস্তুত। প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্র কি ন্যায্য ও সৎ আলোচনার জন্য প্রস্তুত?”

অন্য শীর্ষ নেতাদের হুঁশিয়ারি

এর আগে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফও যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে বলেন, হস্তক্ষেপ করলে মার্কিন বাহিনী ও ইসরায়েল বৈধ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে। একই সঙ্গে তিনি ওয়াশিংটনকে ভুল হিসাব না করার আহ্বান জানান।

এদিকে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিট বলেছেন, ইরান প্রকাশ্যে যা বলছে, ব্যক্তিগত আলোচনায় তাদের বার্তা অনেক ক্ষেত্রে ভিন্ন। মার্কিন গণমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের তথ্যমতে, একদিকে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানে হামলার বিষয়টি বিবেচনা করছে, অন্যদিকে আলোচনার পথও খোলা রাখার চেষ্টা চলছে।

আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রভাব

বিশ্লেষকদের মতে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বৈশ্বিক রাজনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে জ্বালানি বাজার, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও পরমাণু আলোচনা—সব ক্ষেত্রেই এই উত্তেজনার প্রতিফলন পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

Source: Based on reporting from Al Jazeera

Next Post Previous Post

Advertisement