বৈশ্বিক আইনকে বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষা করে ক্ষমতার প্রয়োগ করছে যুক্তরাষ্ট্র: জাতিসংঘ মহাসচিব

আন্তর্জাতিক আইন ও বহুপক্ষীয় নীতিকে উপেক্ষা করে যুক্তরাষ্ট্র ক্রমশ একতরফাভাবে ক্ষমতার প্রয়োগ করছে বলে গুরুতর মন্তব্য করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তনিও গুতেরেস। তাঁর মতে, ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারণে এখন এমন একটি ধারণা প্রবল হয়ে উঠছে, যেখানে আন্তর্জাতিক আইনের চেয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও প্রভাবকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বিবিসি রেডিও ফোরকে দেওয়া এক সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে গুতেরেস বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি স্পষ্ট বিশ্বাস কাজ করছে যে বহুপক্ষীয় সমাধান বা আন্তর্জাতিক কাঠামো এখন আর কার্যকর নয়। তাঁর ভাষায়, মার্কিন প্রশাসনের কাছে মূল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্ষমতার প্রয়োগ, যা অনেক সময় আন্তর্জাতিক আইনের স্বীকৃত মানদণ্ডকে পাশ কাটিয়ে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ ও উদ্বেগ

জাতিসংঘ মহাসচিবের এই মন্তব্য এসেছে এমন এক সময়, যখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক কিছু পদক্ষেপ ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কয়েক সপ্তাহ আগে ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযানের মাধ্যমে দেশটির প্রেসিডেন্টকে আটক করার ঘটনা এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলসংক্রান্ত হুমকি ইউরোপসহ বিভিন্ন অঞ্চলে অস্থিতিশীলতার আশঙ্কা তৈরি করেছে।

গুতেরেস বলেন, এসব কর্মকাণ্ড শুধু নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশ বা অঞ্চলের জন্য নয়, বরং পুরো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার জন্য উদ্বেগজনক। তাঁর মতে, এই ধারা অব্যাহত থাকলে আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা বৈশ্বিক শৃঙ্খলা দুর্বল হয়ে পড়বে।

জাতিসংঘের নীতিমালার ভবিষ্যৎ

সাক্ষাৎকারে জাতিসংঘের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন গুতেরেস। তিনি বলেন, সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাকালীন নীতিগুলো বর্তমানে হুমকির মুখে রয়েছে। বিশেষ করে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সমতা ও সার্বভৌমত্বের নীতিকে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে।

গুতেরেসের মতে, জাতিসংঘ গঠিত হয়েছিল এমন একটি বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে, যেখানে শক্তিশালী ও দুর্বল সব রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় সমান মর্যাদা পাবে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় সেই আদর্শ ক্রমশ ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে।

ট্রাম্প ও জাতিসংঘের সম্পর্ক

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অতীতেও জাতিসংঘের কার্যকারিতা নিয়ে প্রকাশ্যে সমালোচনা করেছেন। গত বছরের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে তিনি সংস্থাটির প্রয়োজনীয়তা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছিলেন।

সে সময় ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, তিনি একাই “সাতটি কখনোই শেষ না হওয়া যুদ্ধের অবসান ঘটিয়েছেন”, যেখানে জাতিসংঘ একটি যুদ্ধ বন্ধ করতেও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল।

বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রভাব

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, বড় শক্তিগুলোর একতরফা আচরণ সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলতে পারে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর। আন্তর্জাতিক আইন দুর্বল হলে ছোট ও মাঝারি রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থ রক্ষা কঠিন হয়ে উঠবে।

এই প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘ মহাসচিবের মন্তব্যকে বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখছেন অনেক কূটনৈতিক ও গবেষক।

Source: Based on reporting from BBC News

Next Post Previous Post

Advertisement