ইসলামিক বিপ্লবের পর যেসব ভয়াবহ ঘটনায় কেঁপেছিল ইরান

১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামিক বিপ্লব ঘটে, যা দেশটির শেষ শাসক শাহকে ক্ষমতাচ্যুত করে। এর পরবর্তী বছরগুলোতে ইরান নানা ধরনের রাজনৈতিক, সামরিক ও প্রাকৃতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়। দেশের ইতিহাসে এই সময়কাল নানা সংহতি, হত্যাকাণ্ড, যুদ্ধ ও প্রকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে চিহ্নিত।

প্রাথমিক বিপ্লব ও রাজনৈতিক অস্থিরতা (১৯৭৯–১৯৮১)

ফেব্রুয়ারি ১৯৭৯-এ আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি ১৪ বছরের নির্বাসনের পর দেশে ফিরে আসেন। এপ্রিলে সংবিধানে পরিবর্তন আনা হয় এবং ইরানকে ইসলামিক প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়। নভেম্বর মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, মূলত তেহরানের মার্কিন দূতাবাসে কূটনৈতিক কর্মীদের জিম্মি করার ঘটনা তুলে ধরে।

১৯৮০ সালে ইরাক ইরানে হামলা চালায়। ইরান-ইরাক যুদ্ধে ৫ লাখের বেশি মানুষ প্রাণ হারান, বিশেষত ইরান ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখোমুখি হয়। ১৯৮১ সালে তেহরানে বোমা হামলায় বিচার বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ বেহেস্তিসহ অনেক নেতাকর্মী নিহত হন। আগস্ট মাসে প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আলী রাজাই ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ জাভাদ বাহানো নিহত হন।

আঞ্চলিক দ্বন্দ্ব ও আন্তর্জাতিক চাপ (১৯৮২–২০০৩)

১৯৮২ সালে ইরান লেবাননের হিজবুল্লাহকে সহায়তা শুরু করে, যা আঞ্চলিক প্রভাবকে শক্তিশালী করে। ১৯৮৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মিসাইল ক্রুজার ইউএসএস ভিনসেনেস ইরানের একটি বেসামরিক বিমান ভূপাতিত করে, যাতে ২৯০ জন প্রাণ হারান। একই বছর ইরাকের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি হয়।

১৯৯০ সালে বড় এক ভূমিকম্প ইরানে আঘাত হানে, ৪০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। ১৯৯৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর তেল ও বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ২০০২ সালে ইরানকে ‘এক্সিস অব ইভিল’-এর অংশ হিসেবে অভিহিত করা হয়। ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক আক্রমণের প্রেক্ষিতে ইরান শিয়া যোদ্ধাদের অর্থায়ন শুরু করে এবং সেই বছর আরও একটি প্রবল ভূমিকম্পে ৪০ হাজার মানুষ নিহত হন।

নিষেধাজ্ঞা ও পারমাণবিক বিতর্ক (২০০৬–২০১৮)

২০০৬ সালে জাতিসংঘ ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ২০০৭ এবং ২০১০ সালে আরও কঠোর অর্থনৈতিক ও অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়। ২০১৫ সালে ইরান পারমাণবিক চুক্তি করে, যার বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ। ২০১৮ সালে ট্রাম্প প্রশাসন এই চুক্তি বাতিল করে এবং নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।

সামাজিক উত্তেজনা ও সামরিক ঘটনা (২০২০–২০২৫)

২০২০ সালে ইসলামিক বিপ্লবী গার্ডের কুদস ফোর্সের প্রধান কাসেম সোলাইমানি ইরাকের বাগদাদে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলায় নিহত হন। ২০২২ সালে হিজাব বিতর্কে মাহসা আমিনি নিহত হন এবং দেশজুড়ে বিক্ষোভ শুরু হয়, এতে ৫ শতাধিক মানুষের মৃত্যু ঘটে। ২০২৪ সালে ইসরায়েলের হামলায় ইরানের দূতাবাসে সাতজন নিহত হন, যার মধ্যে দুইজন বিপ্লবী গার্ড জেনারেল। সেই বছরের মে মাসে হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ বহু প্রাণ হারান।

২০২৫ সালে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে ১২ দিন ধরে যুদ্ধ হয়, এতে ৬১০ ইরানি ও ২৮ ইসরায়েলি নিহত হন।

উপসংহার

ইরানের ইসলামী বিপ্লবের পরের সময়কাল দেশটির জন্য প্রাকৃতিক, রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক চাপের দিকে চিহ্নিত। বিপ্লব, যুদ্ধ, ভূমিকম্প, হত্যাকাণ্ড ও নিষেধাজ্ঞা মিলিয়ে ইরান এই সময়কালে বহু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছে। এই ঘটনাগুলো ইরানের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট সরবরাহ করে।

Source: Based on reporting from Al Jazeera.

Next Post Previous Post

Advertisement