নেতানিয়াহুকে ফেরাউনের সঙ্গে তুলনা করলেন এরদোয়ান

গাজায় চলমান মানবিক সংকটকে কেন্দ্র করে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আবারও কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান। তিনি নেতানিয়াহুর আচরণকে প্রাচীন মিসরের শাসক ফেরাউনের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, গাজার শিশুদের কান্না ও দুর্দশা সারা বিশ্বকে নাড়া দিলেও ইসরাইল এখনো মানবিক সহায়তা প্রবেশে বাধা দিচ্ছে। এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

শুক্রবার (২ জানুয়ারি) ইস্তাম্বুলে জুমার নামাজ আদায়ের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট। তুরস্কভিত্তিক সংবাদমাধ্যম হুরিয়েত ডেইলি নিউজ তার বক্তব্যের বিস্তারিত তুলে ধরেছে।

গাজায় মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে কড়া ভাষা

এরদোয়ান বলেন, গাজার হাজারো শিশু এখন খোলা আকাশের নিচে বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছে। বাতাস, বৃষ্টি ও কাদার মধ্যে জীবন কাটাচ্ছে তারা, কারণ তাদের মাথা গোঁজার মতো নিরাপদ আশ্রয় নেই। তাঁর ভাষায়, “এই শিশুরা কান্না করা ছাড়া আর কিছুই করতে পারছে না। আমরা কন্টেইনার পাঠাতে চাই, কিন্তু নেতানিয়াহু তা হতে দিচ্ছে না।”

তিনি আরও বলেন, মানবিক সহায়তা আটকে রাখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতির পরিপন্থী। এরদোয়ানের মতে, গাজায় যা ঘটছে তা শুধু একটি আঞ্চলিক সংকট নয়, বরং পুরো মানবতার জন্য একটি বড় পরীক্ষা।

ফিলিস্তিনপন্থী জনসমর্থনের প্রশংসা

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট ১ জানুয়ারি ইস্তাম্বুলের ঐতিহাসিক গালাতা সেতুতে অনুষ্ঠিত বৃহৎ ফিলিস্তিনপন্থী সমাবেশের কথাও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এই সমাবেশ প্রমাণ করে ফিলিস্তিন একা নয়। তুরস্কের জনগণ এবং মুসলিম বিশ্ব গাজার মানুষের পাশে রয়েছে এবং থাকবে।

এরদোয়ান আশ্বাস দেন, তুরস্ক তার সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে গাজাবাসীর পাশে দাঁড়াবে। তাঁর ভাষায়, “আজ হোক বা কাল, আল্লাহর ইচ্ছায় আমরা এই নির্যাতিত মানুষদের কষ্ট থেকে মুক্ত করতে চেষ্টা চালিয়ে যাব।”

ইসরাইলের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের টানাপোড়েন

২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজা সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে তুরস্ক ও ইসরাইলের সম্পর্ক দ্রুত অবনতির দিকে গেছে। রাজনৈতিক অবস্থানের পাশাপাশি এর প্রভাব পড়েছে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কেও।

সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে তুরস্ক ইসরাইলে এক হাজারের বেশি পণ্য রপ্তানি নিষিদ্ধ করে। পরে আরও কঠোর অবস্থান নিয়ে আঙ্কারা সব ধরনের রপ্তানি, আমদানি ও ট্রানজিট বাণিজ্য পুরোপুরি স্থগিত করার ঘোষণা দেয়। বিশ্লেষকদের মতে, এটি তুরস্কের পক্ষ থেকে ইসরাইলের ওপর সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক চাপগুলোর একটি।

বাংলাদেশসহ মুসলিম বিশ্বে প্রভাব

এরদোয়ানের বক্তব্য শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই নয়, বাংলাদেশসহ মুসলিম বিশ্বে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক মহল দীর্ঘদিন ধরেই গাজায় যুদ্ধবিরতি ও মানবিক সহায়তা প্রবেশের দাবি জানিয়ে আসছে। তুরস্কের মতো একটি প্রভাবশালী মুসলিম দেশের অবস্থান ফিলিস্তিন ইস্যুতে আন্তর্জাতিক চাপ আরও বাড়াতে পারে বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গাজা সংকট ঘিরে মুসলিম দেশগুলোর ঐক্য জোরদার হলে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে ইসরাইলের ওপর রাজনৈতিক ও মানবিক চাপ বাড়তে পারে।

উপসংহার

গাজা সংকট যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে উত্তেজনা বাড়ছে। এরদোয়ানের সাম্প্রতিক মন্তব্য ইসরাইল-তুরস্ক সম্পর্ককে আরও জটিল করতে পারে, তবে একই সঙ্গে এটি গাজার মানবিক বিপর্যয় বিশ্ববাসীর সামনে নতুন করে তুলে ধরেছে। আগামী দিনে এই কূটনৈতিক অবস্থান পরিস্থিতির মোড় ঘোরাতে পারে কি না, তা এখন দেখার বিষয়।

Source: Based on reporting from Hürriyet Daily News and Amader Desh Online

Next Post Previous Post

Advertisement