ইরানে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা

দেশজুড়ে চলমান সহিংস বিক্ষোভে বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রাণহানির প্রেক্ষাপটে ইরানে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে। স্থানীয় সময় রোববার (১১ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়। প্রেসিডেন্টের দপ্তর জানিয়েছে, নিহতদের স্মরণে প্রেসিডেন্ট ও মন্ত্রিসভা আনুষ্ঠানিকভাবে শোক পালন করছে।

এই ঘোষণার মাধ্যমে ইরানের বর্তমান রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির গুরুতর দিকটি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বিভিন্ন শহরে সহিংসতা, ভাঙচুর ও প্রাণহানির ঘটনায় দেশটির অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণার পটভূমি

ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সির বরাতে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলবিরোধী প্রতিরোধ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে সংঘটিত সাম্প্রতিক সহিংসতায় যারা নিহত হয়েছেন, তাদের স্মরণেই এই জাতীয় শোক পালন করা হচ্ছে। প্রেসিডেন্টের দপ্তর এক বিবৃতিতে জানায়, নিহতদের প্রতি সম্মান জানাতে রাষ্ট্রীয়ভাবে সব কর্মসূচিতে শোকের আবহ বজায় রাখা হবে।

সরকারি বিবৃতিতে দাবি করা হয়, এই সহিংসতায় সাধারণ মানুষ, বাসিজ স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর সদস্য এবং পুলিশ সদস্যরা লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন। ফলে হতাহতের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

সরকারি বক্তব্য ও অভিযোগ

ইরান সরকারের বিবৃতিতে সাম্প্রতিক সহিংসতাকে “নজিরবিহীন” আখ্যা দিয়ে বলা হয়েছে, এসব ঘটনায় দায়েশ (আইএসআইএল বা আইএসআইএস)-এর মতো উগ্র সহিংসতার কৌশল অনুসরণ করা হয়েছে। বিবৃতিতে আরও দাবি করা হয়, এই দাঙ্গার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।

সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব সহিংস কার্যক্রম কেবল রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি নয়, বরং সাধারণ নাগরিকদের জীবনকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে।

ভাঙচুর ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি

তাসনিম নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে ‘রাজতন্ত্রপন্থি সহিংস দাঙ্গাকারীরা’ ইরানের বিভিন্ন শহরে সরকারি ও বেসরকারি স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। এসব ঘটনায় সরকারি ভবন, প্রশাসনিক কার্যালয় ও পুলিশ স্টেশনে ভাঙচুরের পাশাপাশি সড়ক অবরোধের ঘটনাও ঘটেছে।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, এই সহিংসতায় নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সদস্য আহত হয়েছেন এবং সাধারণ নাগরিকদের মধ্যেও প্রাণহানি ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।

দায়ীদের বিচারের আশ্বাস

ইরান সরকার সহিংসতার জন্য দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। একই সঙ্গে জনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।

বিশ্লেষকদের মতে, এই শোক ঘোষণা একদিকে নিহতদের প্রতি রাষ্ট্রীয় শ্রদ্ধা, অন্যদিকে সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের রাজনৈতিক বার্তা বহন করছে।

আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট

মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে ইরানের এই অভ্যন্তরীণ সহিংসতা আঞ্চলিক রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে সরাসরি দায়ী করার বক্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিতে পারে।

উপসংহার

তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা ইরানের সাম্প্রতিক সহিংস পরিস্থিতির গভীরতা তুলে ধরছে। সরকার যেখানে কঠোর অবস্থান নেওয়ার কথা বলছে, সেখানে দেশটির অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগামী দিনগুলোতে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক মহলের নজরে থাকবে।

Source: Based on reporting from Tasnim News Agency.

Next Post Previous Post

Advertisement