জিয়াউলের বিরুদ্ধে যা বললেন সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম
আওয়ামী লীগের দেড় দশকের শাসনামলে সংঘটিত গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে বরখাস্ত সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেছেন সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়া। ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কাছে দেওয়া তার জবানবন্দিতে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামোর ভেতরে ক্ষমতার অপব্যবহার, শৃঙ্খলা ভঙ্গ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের বিস্তৃত চিত্র উঠে এসেছে।
চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম জানিয়েছেন, গুম-খুন সংক্রান্ত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ট্রাইব্যুনাল-১–এ সাক্ষ্য দেবেন সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম। মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের শুনানি শেষে আদালত আগামী ১৪ জানুয়ারি এ বিষয়ে আদেশের দিন নির্ধারণ করেছেন।
র্যাবে দায়িত্ব পাওয়ার পর আচরণ বদলের অভিযোগ
জবানবন্দিতে ইকবাল করিম ভূঁইয়া উল্লেখ করেন, র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (এডিজি) হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর জিয়াউল আহসানের আচরণ ক্রমেই উচ্ছৃঙ্খল হয়ে ওঠে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়। আর্মি সিকিউরিটি ইউনিট (এএসইউ) থেকে পাওয়া তথ্যেও একই ধরনের উদ্বেগজনক চিত্র উঠে আসে।
তিনি আরও জানান, জিয়াউল আহসান নিজের আবাসিক টাওয়ারে সশস্ত্র গার্ড মোতায়েন, বাসায় অস্ত্র সংরক্ষণ এবং ফ্ল্যাটজুড়ে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করেন—যা সামরিক নিয়মের পরিপন্থী। এসব বিষয়ে তাকে সতর্ক করা হলেও পরবর্তী সময়ে তার আচরণে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আসেনি বলে দাবি করেন সাবেক সেনাপ্রধান।
শৃঙ্খলাভঙ্গ ও ‘পারসোনা নন গ্রাটা’ ঘোষণা
ইকবাল করিম বলেন, জিয়াউল আহসানকে বোঝাতে কয়েকজন ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হলেও তা ফলপ্রসূ হয়নি। একপর্যায়ে নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেনারেল তারিক আহমেদ সিদ্দিক ও তার ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে তিনি সেনাপ্রধানের নির্দেশনাকেও চ্যালেঞ্জ করতে শুরু করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তাকে ক্যান্টনমেন্টের একটি অংশে ‘পারসোনা নন গ্রাটা’ ঘোষণা করা হয়।
রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ও অভিযোগের বিস্তার
জবানবন্দিতে সাবেক সেনাপ্রধান রাজনৈতিক ও সামরিক প্রশাসনের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটও তুলে ধরেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার কৌশল হিসেবে সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন বাহিনীতে নির্দিষ্ট কর্মকর্তাদের সরিয়ে অনুগতদের বসানো হয়। নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ পাওয়া তারিক আহমেদ সিদ্দিক ধীরে ধীরে ডিজিএফআই, এনএসআই, র্যাবসহ একাধিক বাহিনীর ওপর প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এই প্রভাবের ফলেই গুম, খুন, অপহরণ ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে বলে জবানবন্দিতে দাবি করা হয়।
বিচার প্রক্রিয়া ও এর তাৎপর্য
গত ১৫ বছরে শতাধিক ব্যক্তিকে গুম করে হত্যার অভিযোগে জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে চলমান এই বিচারিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১–এ। বিশ্লেষকদের মতে, এই মামলার বিচার বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।
বিচার প্রক্রিয়ার অগ্রগতি এখন দেশের রাজনীতি ও আইনাঙ্গনে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে, কারণ এই মামলার রায় ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
Source: Based on reporting from আমার দেশ
