বিএনপির রাজনীতি নিষিদ্ধ চাওয়া যুবলীগ নেতাকে নিয়ে ডিসি অফিসে হাসনাত

কুমিল্লায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইকে ঘিরে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে একটি ছবি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ওই ছবিতে দেখা যায়, বিএনপির রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে অতীতে সক্রিয় থাকা এক যুবলীগ নেতাকে পাশে বসিয়ে জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে উপস্থিত হয়েছেন এনসিপি ও জামায়াত জোটের মনোনীত প্রার্থী হাসনাত আবদুল্লাহ। বিষয়টি ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে এবং সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়েছে।

শুক্রবার কুমিল্লা জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ছয়টি সংসদীয় আসনের মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে কুমিল্লা-৪ (দেবিদ্বার) আসনের যাচাই কার্যক্রম শুরু হয় দুপুর আড়াইটার দিকে। ওই সময় এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও জোটপ্রার্থী হাসনাত আবদুল্লাহ তাঁর নেতাকর্মীদের নিয়ে কার্যালয়ের হলরুমে অবস্থান করেন।

ভাইরাল ছবি ও পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন

ভাইরাল হওয়া ছবি ও ভিডিওতে হাসনাত আবদুল্লাহর পাশের চেয়ারে বসে থাকতে দেখা যায় জাকির হোসেনকে। তিনি ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার মালাপাড়া ইউনিয়ন যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক এবং কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সদস্য হিসেবে পরিচিত। স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, জাকির হোসেন অতীতে আওয়ামী লীগ–ঘনিষ্ঠ কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন এবং একটি সময় কুমিল্লা-৫ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আবু জাহেরের ঘনিষ্ঠ হিসেবেও পরিচিত ছিলেন।

ছবি ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন উঠেছে—একজন যুবলীগ নেতার সঙ্গে কীভাবে বিরোধী জোটের প্রার্থী একই স্থানে ও একই সারিতে বসে নির্বাচনী কার্যক্রমে অংশ নিলেন। অনেকেই এটিকে রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মন্তব্য করছেন।

স্থানীয় প্রতিক্রিয়া ও অভিযোগ

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ব্রাহ্মণপাড়ার মালাপাড়া ইউনিয়নের এক বাসিন্দা বলেন, আগের শাসনামলে জাকির হোসেনের আচরণে স্থানীয় মানুষ ক্ষুব্ধ ছিল। তাঁর দাবি, এখন রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে জাকির হোসেন অবস্থান পরিবর্তনের চেষ্টা করছেন। তিনি আরও বলেন, যারা তাঁকে আশ্রয় বা প্রশ্রয় দিচ্ছেন, তাদের ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।

এদিকে ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা ছাত্রদলের নেতা সোহেল আহমেদ অভিযোগ করেন, ২০২২ সালে জাকির হোসেন বিএনপির রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে স্মারকলিপি দিয়েছিলেন। তাঁর ভাষায়, “যিনি বিএনপির রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি করেছিলেন, আজ তাঁকে সঙ্গে নিয়ে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে যাওয়া জুলাইয়ের শহীদদের আত্মত্যাগের সঙ্গে বেইমানির শামিল।”

হাসনাত আবদুল্লাহর বক্তব্য

এ বিষয়ে জানতে চাইলে এনসিপির মনোনীত প্রার্থী হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আইডিএলসি ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা। এর বাইরে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় বা অতীত সম্পর্কে তিনি অবগত নন বলে দাবি করেন। তবে এই ব্যাখ্যা সমালোচকদের অনেককেই সন্তুষ্ট করতে পারেনি।

রাজনৈতিক প্রভাব ও বিশ্লেষণ

বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনী পরিবেশে এমন ছবি ও উপস্থিতি ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে যেসব ব্যক্তি বা দল অতীতে একে অপরের বিরোধিতা করেছে, তাদের একই প্ল্যাটফর্মে দেখা গেলে রাজনৈতিক অবস্থানের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কুমিল্লার মতো রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল জেলায় বিষয়টি ভোটের মাঠে প্রভাব ফেলতে পারে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মনোনয়ন যাচাই-বাছাইয়ের মতো আনুষ্ঠানিক ও গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারীদের পরিচয় ও অবস্থান নিয়ে স্পষ্টতা থাকা জরুরি—এমন মত দিয়েছেন স্থানীয় নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। তারা বলছেন, নির্বাচনকে ঘিরে আস্থা বজায় রাখতে সব পক্ষেরই দায়িত্বশীল আচরণ প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে, কুমিল্লায় মনোনয়ন যাচাই-বাছাইয়ের একটি মুহূর্তের ছবি এখন বড় রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, যা আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে আরও আলোচনার জন্ম দিতে পারে।

Source: Based on reporting from দৈনিক আমার দেশ

Next Post Previous Post

Advertisement