শহীদ ওসমান হাদির স্মরণে ঢাবিতে ‘মোনাজাত-ই-ইনসাফ

শহীদ ওসমান হাদির স্মরণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে দিনব্যাপী ‘মোনাজাত-ই-ইনসাফ’ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) ধর্মীয় আচার, স্মরণানুষ্ঠান ও সম্মিলিত ইফতারের মধ্য দিয়ে এই আয়োজন সম্পন্ন হয়। আয়োজকেরা জানান, কর্মসূচির মূল লক্ষ্য ছিল শহীদদের আত্মার মাগফেরাত কামনার পাশাপাশি ন্যায়বিচার, নৈতিকতা ও দেশীয় সাংস্কৃতিক চেতনা জাগ্রত করা।

ক্যাম্পাসভিত্তিক এই কর্মসূচিতে বিভিন্ন অনুষদের শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। আয়োজনে শহীদ ওসমান হাদির পাশাপাশি সদ্যপ্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার আত্মার মাগফেরাত কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত করা হয়।

দিনব্যাপী ধর্মীয় ও স্মরণানুষ্ঠান

আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, কর্মসূচির শুরুতেই অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা রোজা রাখেন। বাদ জোহর সম্মিলিত কোরআন খতম অনুষ্ঠিত হয়। বিকেল ৩টায় নতুন বছরের শুরু উপলক্ষে সালাতুল হাজত আদায় করা হয়, যাতে ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক কল্যাণ কামনা করা হয়।

এরপর বাদ আসর শহীদ ওসমান হাদির কবর জিয়ারত করেন শিক্ষার্থীরা। কবর জিয়ারত শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির সবুজ চত্বরে তাঁর আত্মার মাগফেরাত কামনায় দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। একই অনুষ্ঠানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার আত্মার শান্তি কামনাও করা হয়। মাগরিবের আগে রোজাদার শিক্ষার্থীরা সম্মিলিত ইফতারে অংশ নেন, যা কর্মসূচির মানবিক ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দিকটি তুলে ধরে।

বক্তব্যে সাংস্কৃতিক ও নৈতিক বার্তা

দোয়া মাহফিলে বক্তব্য দেন ইনকিলাব মঞ্চের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আহ্বায়ক ফাতিমা তাসনিম জুমা। তিনি বলেন, শহীদ ওসমান হাদির সংগ্রাম ছিল বাংলাদেশের সব শ্রেণি ও পেশার মানুষের কাছে আধিপত্যবাদবিরোধী সাংস্কৃতিক লড়াই পৌঁছে দেওয়ার প্রচেষ্টা। তাঁর মতে, এই সংগ্রাম কোনো একক সংগঠনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সমাজের বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়াই ছিল এর লক্ষ্য।

তিনি আরও বলেন, ওসমান হাদি জীবদ্দশায় কখনো কাউকে নির্দিষ্ট কোনো প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানাননি। বরং তিনি বিশ্বাস করতেন, একই চেতনায় বিশ্বাসী বহু সংগঠন ও মানুষ প্রয়োজন, যারা সম্মিলিতভাবে এই সাংস্কৃতিক সংগ্রামকে এগিয়ে নেবে।

শিল্প, সংস্কৃতি ও শিক্ষার ওপর গুরুত্ব

বক্তব্যে ফাতিমা তাসনিম জুমা শিক্ষার্থীদের নৈতিক দায়িত্ববোধ ও পড়াশোনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, জীবদ্দশায় শহীদ ওসমান হাদি হয়তো নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হতে দেখেননি, তবে আজ দেশের বহু মানুষের মধ্যে সেই চেতনার বিস্তার ঘটেছে। আধিপত্যবাদকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য মানসিক প্রস্তুতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি শিল্প ও সংস্কৃতির প্রতিটি প্রকাশে বাংলাদেশের পরিচয় তুলে ধরার আহ্বান জানান। তাঁর ভাষায়, শিল্প-সাহিত্যের নামে অন্য দেশের সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ কিংবা ইসলামফোবিয়া বা দেশীয় কৃষ্টি-সংস্কৃতির বিকৃত ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য নয়। এসবের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার পথে না গিয়ে বিকল্প সৃজনশীল কাজের মাধ্যমে বাংলাদেশের সত্তা বিশ্বদরবারে তুলে ধরার ওপর তিনি জোর দেন।

ক্যাম্পাসে প্রতিক্রিয়া ও গুরুত্ব

ঢাবির শিক্ষার্থীদের একটি অংশ মনে করছে, ‘মোনাজাত-ই-ইনসাফ’ কর্মসূচি ক্যাম্পাসে শোক ও স্মরণের পাশাপাশি নৈতিক ও সাংস্কৃতিক আলোচনার একটি পরিসর তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এমন শান্তিপূর্ণ ও ধর্মীয়-সামাজিক উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের মধ্যে সহনশীলতা ও মূল্যবোধ গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে।

শেষ কথা

শহীদ ওসমান হাদির স্মরণে ঢাবিতে আয়োজিত এই কর্মসূচি স্মরণ, দোয়া ও সাংস্কৃতিক সচেতনতার সমন্বয়ে একটি তাৎপর্যপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আয়োজকেরা বলছেন, ভবিষ্যতেও ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও দেশীয় চেতনার পক্ষে এমন আয়োজন অব্যাহত থাকবে।

Source: Based on reporting from Dhaka Post

Next Post Previous Post

Advertisement