ট্রাম্পের হুমকি সত্বেও ইরানে সরাসরি হামলা কেন কঠিন

ঢাকা — ইরানে চলমান বিক্ষোভ ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একাধিকবার কঠোর হুঁশিয়ারি দিলেও, বাস্তবে ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক হামলা চালানো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সহজ নয়। কৌশলগত, রাজনৈতিক, সামরিক ও আন্তর্জাতিক নানা জটিল কারণে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন বড় ধরনের ঝুঁকির সঙ্গে জড়িত বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

ইরানের শক্তিশালী সামরিক সক্ষমতা

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান একটি শক্তিশালী সামরিক শক্তি হিসেবে পরিচিত। দেশটির রয়েছে বড় আকারের সেনাবাহিনী, উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারকারী আধাসামরিক বাহিনী। বিশেষ করে ব্যালিস্টিক মিসাইল সক্ষমতা ও ড্রোন প্রযুক্তি ইরানকে সরাসরি হামলার ক্ষেত্রে একটি বড় প্রতিপক্ষ করে তুলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে ইরান তাৎক্ষণিকভাবে পাল্টা আঘাত হানতে সক্ষম।

আঞ্চলিক যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা

ইরানে হামলা মানেই শুধু দুই দেশের মধ্যে সংঘাত নয়। ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত—লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইরাক ও সিরিয়ার মিলিশিয়া এবং ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী। এসব গোষ্ঠী যুক্তরাষ্ট্র বা তার মিত্রদের ওপর হামলা চালাতে পারে। ফলে সংঘাত দ্রুত পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে, যা বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি বাজারে বড় ধাক্কা দিতে পারে।

মার্কিন ঘাঁটি ও মিত্রদের নিরাপত্তা ঝুঁকি

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অসংখ্য সামরিক ঘাঁটি রয়েছে—ইরাক, কুয়েত, কাতার, বাহরাইনসহ বিভিন্ন দেশে। ইরান সরাসরি বা পরোক্ষভাবে এসব ঘাঁটিকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। একই সঙ্গে ইসরায়েল ও উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলোর নিরাপত্তাও গুরুতর হুমকির মুখে পড়বে। এ কারণে হামলার সিদ্ধান্ত মানেই দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সম্পৃক্ততা।

আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনৈতিক চাপ

জাতিসংঘের অনুমোদন ছাড়া কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রে হামলা চালানো আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন ও রাশিয়ার মতো প্রভাবশালী শক্তিগুলো ইরান ইস্যুতে সামরিক সমাধানের বিরোধিতা করে আসছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র একতরফা হামলা চালালে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপ ও বিচ্ছিন্নতার ঝুঁকি বাড়বে।

যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতা

মার্কিন জনমতও ইরানে নতুন যুদ্ধের পক্ষে নেই। আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞতার পর যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে ব্যাপক ক্লান্তি রয়েছে। কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া বড় ধরনের হামলা রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত হয়ে উঠতে পারে, যা যেকোনো প্রশাসনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

অর্থনৈতিক ও বৈশ্বিক প্রভাব

ইরান পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীর কাছাকাছি অবস্থান করছে, যেখান দিয়ে বিশ্বের একটি বড় অংশের তেল পরিবহন হয়। সংঘাত শুরু হলে তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করবে। বাংলাদেশসহ জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

উপসংহার

ট্রাম্পের কঠোর বক্তব্য রাজনৈতিক চাপ ও কূটনৈতিক কৌশলের অংশ হলেও, বাস্তবে ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক হামলা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত। সামরিক শক্তি, আঞ্চলিক অস্থিরতা, আন্তর্জাতিক আইন এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রভাব—সব মিলিয়ে এই পথ বেছে নেওয়া যে কতটা কঠিন, তা স্পষ্ট করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।

Next Post Previous Post

Advertisement