পাকিস্তানের সেনাপ্রধানকে ‘অত্যন্ত সম্মানিত’ ব্যক্তি স্বীকৃতি দিয়ে যা বললেন ট্রাম্প
পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ও জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ কমিটির চেয়ারম্যান (সিডিএফ) ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরকে “অত্যন্ত সম্মানিত জেনারেল” হিসেবে অভিহিত করে প্রকাশ্য প্রশংসা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফ্লোরিডার পাম বিচে নিজের মার-এ-লাগো বাসভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই মন্তব্য করেন তিনি। ট্রাম্পের বক্তব্য দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা রাজনীতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক কৌশল নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
পাকিস্তানের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ডন-এর বরাতে প্রকাশিত খবরে বলা হয়, সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধসহ বৈশ্বিক বিভিন্ন সংকট প্রসঙ্গে কথা বলেন। এ সময় তিনি দাবি করেন, তাঁর প্রশাসন এখন পর্যন্ত “আটটি যুদ্ধ বন্ধ করতে সক্ষম হয়েছে।” এর মধ্যে ভারত-পাকিস্তানের সম্ভাব্য একটি পারমাণবিক সংঘাতও রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
ভারত-পাকিস্তান সংঘাত নিয়ে ট্রাম্পের দাবি
ট্রাম্প বলেন, “পাকিস্তানের প্রধান এবং একজন অত্যন্ত সম্মানিত জেনারেল—তিনি একজন ফিল্ড মার্শাল—এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন যে রাষ্ট্রপতি ট্রাম্প সেই যুদ্ধ থামিয়ে প্রায় এক কোটি মানুষের জীবন বাঁচিয়েছেন।” তাঁর ভাষায়, সংঘাত চলাকালে পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর হয়ে উঠেছিল যে তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি ছিল।
তিনি আরও দাবি করেন, ওই সংঘাতের সময় “আটটি বিমান গুলি করে ভূপাতিত করা হয়েছিল এবং যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছিল।” তবে এই সংখ্যার বিষয়ে ট্রাম্পের বক্তব্য আগেও একাধিকবার পরিবর্তিত হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভ্রান্তি তৈরি করেছে।
মুনিরের প্রতি ট্রাম্পের ধারাবাহিক প্রশংসা
ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের প্রতি এটি ট্রাম্পের প্রথম প্রশংসা নয়। চলতি বছরের জুন মাসে ওয়াশিংটনে এক বৈঠকের পর থেকেই ট্রাম্প পাকিস্তানের সেনাপ্রধানের ভূয়সী প্রশংসা করে আসছেন। ১৯ জুন হোয়াইট হাউসে মধ্যাহ্নভোজে আমন্ত্রণ জানিয়ে তিনি মুনিরকে যে সম্মান দেখান, তা যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে কোনো পাকিস্তানি সেনাপ্রধানের ক্ষেত্রে বিরল বলে মনে করা হচ্ছে।
এরপর বিভিন্ন বক্তব্যে ট্রাম্প একাধিকবার মুনিরকে “আমার প্রিয় ফিল্ড মার্শাল” বলে উল্লেখ করেন। ২৯ অক্টোবর এক বক্তব্যে তিনি মে মাসের ভারত-পাকিস্তান সংঘাত প্রসঙ্গে মুনিরকে “মহান যোদ্ধা” হিসেবেও আখ্যায়িত করেন। একই সঙ্গে তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে নিজের সম্পর্ককে “চমৎকার” বলে উল্লেখ করেন এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ও সেনাপ্রধানকেও “দুর্দান্ত ব্যক্তি” হিসেবে বর্ণনা করেন।
মে মাসের সংঘাতের পটভূমি
চলতি বছরের মে মাসে অধিকৃত কাশ্মীরে হিন্দু পর্যটকদের ওপর হামলার ঘটনার পর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে চার দিনের তীব্র সামরিক সংঘাত শুরু হয়। ভারত প্রমাণ ছাড়াই ওই হামলায় পাকিস্তানের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তোলে, যা ইসলামাবাদ সরাসরি অস্বীকার করে।
এই সংঘাতে উভয় পক্ষই যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র, কামান ও ড্রোন ব্যবহার করে। পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে উঠলে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। পরে কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে দুই দেশ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়।
বিমান ভূপাতিত নিয়ে বিতর্ক
সংঘাতের পর পাকিস্তান দাবি করে, তারা ছয়টি ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে, যার মধ্যে ফরাসি নির্মিত রাফায়েলও রয়েছে। ভারত এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে কেবল “কিছু ক্ষয়ক্ষতি” স্বীকার করে। পরবর্তীতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ জাতিসংঘে বক্তব্যে সাতটি ভারতীয় বিমান ধ্বংসের দাবি করেন।
এদিকে ট্রাম্প নিজেও বিভিন্ন সময় এই সংঘাতের বর্ণনা দিতে গিয়ে কখনও সাতটি, কখনও আটটি বিমান ভূপাতিত হওয়ার কথা বলেছেন। এই অসঙ্গত বক্তব্য আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে এবং সংঘাতের প্রকৃত চিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতিতে তাৎপর্য
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই প্রকাশ্য প্রশংসা যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তান সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতার ইঙ্গিত দেয়। একই সঙ্গে এটি দক্ষিণ এশিয়ার শক্তির ভারসাম্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক কৌশলে পরিবর্তনের বার্তা বহন করতে পারে। বিশেষ করে ভারত ও পাকিস্তান—দুই দেশের সঙ্গেই সম্পর্ক বজায় রেখে ওয়াশিংটন কীভাবে নিজের প্রভাব ধরে রাখতে চায়, সেই প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে।
বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের জন্যও এই বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের উত্তেজনা বা প্রশমন পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা ও কূটনীতিতে প্রভাব ফেলে।
উপসংহার
ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরকে ঘিরে ট্রাম্পের ধারাবাহিক প্রশংসা কেবল ব্যক্তিগত কূটনৈতিক সৌজন্য নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অগ্রাধিকার ও কৌশলের ইঙ্গিত বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তবে বাস্তবে এই বক্তব্য কতটা কূটনৈতিক বাস্তবতায় রূপ নেয়, তা নির্ভর করবে আগামী দিনের আঞ্চলিক পরিস্থিতি ও ওয়াশিংটনের নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর।
Source: Based on reporting from Dawn, published by Amar Desh Online
