ইউক্রেন চুক্তিতে ভূখণ্ড বিনিময়ে আলোচনায় প্রস্তুত রাশিয়া
ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান ঘটাতে সম্ভাব্য শান্তিচুক্তির অংশ হিসেবে সীমিত পরিসরে ভূখণ্ড বিনিময় নিয়ে আলোচনায় বসতে পারে রাশিয়া—এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। তবে শর্ত হিসেবে তিনি স্পষ্ট করেছেন, ডনবাস অঞ্চল পুরোপুরি রাশিয়ার অধীনেই থাকতে হবে। রাশিয়ার প্রভাবশালী দৈনিক কোমারসান্ত-এর বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৪ ডিসেম্বর গভীর রাতে ক্রেমলিনে রাশিয়ার শীর্ষ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এক বৈঠকে সম্ভাব্য শান্তি পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন পুতিন। সেখানে তিনি বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে রাশিয়ার অবস্থানে কোনো মৌলিক পরিবর্তন আসেনি। তাঁর বক্তব্য উদ্ধৃত করে পত্রিকাটি লিখেছে, “ডনবাস আমাদের”—এই অবস্থানেই মস্কো অনড় রয়েছে। তবে ডনবাসের বাইরে রুশ নিয়ন্ত্রণে থাকা কিছু এলাকায় সীমিত ভূখণ্ড বিনিময়ের সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করা হয়নি।
রাশিয়ার শর্ত ও নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল
কোমারসান্তের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে রাশিয়া ২০১৪ সালে দখল করা পুরো ক্রিমিয়া অঞ্চল ছাড়াও ডনবাসের প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। পাশাপাশি জাপোরিঝিয়া ও খেরসন অঞ্চলের প্রায় ৭৫ শতাংশ এবং খারকিভ, সুমি, মাইকোলাইভ ও দিনিপ্রোপেত্রোভস্ক অঞ্চলের কিছু অংশও রুশ বাহিনীর দখলে রয়েছে।
গত ১৯ ডিসেম্বর পুতিন বলেন, শান্তিচুক্তির ভিত্তি হতে পারে ২০২৪ সালে নির্ধারিত রাশিয়ার শর্তগুলো। এর মধ্যে রয়েছে—ডনবাস, জাপোরিঝিয়া ও খেরসন অঞ্চল থেকে ইউক্রেনীয় সেনা প্রত্যাহার এবং ন্যাটোতে যোগ দেওয়ার লক্ষ্য থেকে কিয়েভের সরে আসা। এই শর্তগুলো ইউক্রেন ও পশ্চিমা মিত্রদের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান
এদিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের প্রতিনিধিদলগুলোর মধ্যে একটি ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনা চূড়ান্ত করার বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে। তবে ডনবাসের যেসব অংশ এখনো ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, সেগুলো ছাড়ার প্রশ্নে এবং রুশ নিয়ন্ত্রণাধীন জাপোরিঝিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনো কোনো সমঝোতা হয়নি বলে জানান তিনি।
বিশ্লেষকদের মতে, ডনবাস ও জাপোরিঝিয়া ইস্যুতে সমঝোতা না হলে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন কঠিন হবে। ইউরোপের সবচেয়ে বড় জাপোরিঝিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি যুদ্ধের শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই বিদ্যুৎকেন্দ্র যৌথভাবে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র পরিচালনার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের ভূমিকা ও কূটনৈতিক তৎপরতা
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউরোপে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে ভয়াবহ এই সংঘাতের অবসান ঘটানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছেন। তাঁর বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জামাতা জ্যারেড কুশনার রাশিয়া, ইউক্রেন ও ইউরোপীয় শক্তিগুলোর সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনার পূর্ণ বিবরণ এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
রাশিয়ার কর্মকর্তারা এর আগে দাবি করেছিলেন, আলাস্কার অ্যাঙ্কোরেজে পুতিন ও ট্রাম্পের মধ্যে হওয়া এক বৈঠকে কিছু বিষয়ে ‘বোঝাপড়া’ হয়েছিল। তবে সেই বোঝাপড়ার প্রকৃতি কী ছিল, তা প্রকাশ্যে আসেনি।
যুদ্ধের পটভূমি ও সামনে পথ
উল্লেখ্য, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরু করে রাশিয়া, যাকে ক্রেমলিন এখনো ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ বলে উল্লেখ করে আসছে। প্রায় তিন বছর ধরে চলা এই যুদ্ধে ইউক্রেনের অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূখণ্ড বিনিময় নিয়ে আলোচনার ইঙ্গিত যুদ্ধ অবসানের সম্ভাবনা তৈরি করলেও ডনবাস প্রশ্নে রাশিয়ার কঠোর অবস্থান শান্তি প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলছে। আসন্ন দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর কূটনৈতিক তৎপরতার ওপরই নির্ভর করবে এই যুদ্ধ কোন পথে এগোবে।
Source: Based on reporting from Reuters
