বৃষ্টি মানেই আতঙ্ক: জলাবদ্ধতায় বিপর্যস্ত নোয়াখালীবাসী, উন্নয়ন চায় জনগণ
নোয়াখালী জেলায় বর্ষার শুরুতেই দেখা দিয়েছে আতঙ্কের পরিবেশ। স্থানীয় বাসিন্দারা জানাচ্ছেন, বৃষ্টি নামলেই তারা শঙ্কিত হয়ে পড়েন। কারণ, গত বছরের ভয়াবহ বন্যা তাদের মনে রেখেছে স্থায়ী দুঃসহ স্মৃতি। সেসময়ের জলাবদ্ধতা, ঘরবাড়ি তলিয়ে যাওয়া, রোগব্যাধি ও খাদ্য সংকট মিলিয়ে জীবনযাপন হয়ে উঠেছিল দুর্বিষহ। সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হলো, সেই অভিজ্ঞতা থেকেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন হয়নি।
নোয়াখালীর বিভিন্ন উপজেলা যেমন সুধারাম, বেগমগঞ্জ, কোম্পানীগঞ্জ, চাটখিল ও সেনবাগে বর্ষার প্রাথমিক বৃষ্টিপাতেই পানি জমে যাচ্ছে রাস্তাঘাটে ও বসতবাড়িতে। গত বছর প্রায় পুরো জেলার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বন্যায়। এর ফলে ঘরবাড়ি নষ্ট হওয়া, ফসল নষ্ট, শিশু ও বয়স্কদের রোগে আক্রান্ত হওয়া, এবং পানিবন্দি অবস্থায় দীর্ঘদিন কাটানো—এসব অভিজ্ঞতা অনেকেই এখনো ভুলতে পারেননি।
“গতবার ১০ দিন দোকান খুলতে পারিনি, সারা পরিবার পানি বন্দি ছিলাম। এ বছরও বৃষ্টি শুরু হতে না হতেই ভয় লাগছে, যদি আবার সেই অবস্থা হয়।” — মো. ইসমাইল হোসেন, দোকানদার
“শুধু শহর না, গ্রামের অবস্থাও ভয়াবহ। কোনো ড্রেন নেই, যে আছে তা বন্ধ বা ভেঙে গেছে। প্রতি বছর কেবল প্রতিশ্রুতি শুনি, কাজ দেখি না।” — আফসানা বেগম, কলেজ শিক্ষার্থী
জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে জানানো হয়, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নে কিছু প্রকল্প প্রস্তাবিত হয়েছে, তবে তা এখনো বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছায়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান,
“বাজেট ও পরিকল্পনার ঘাটতির কারণে প্রকল্পগুলো সময়মতো শুরু করা যাচ্ছে না, তবে আমরা কাজ করছি।”
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে টানা কয়েকদিনের ভারী বর্ষণে নোয়াখালী জেলার প্রায় ৮০% গ্রাম ও শহর এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছিল। দুর্বল নালা-নর্দমা ব্যবস্থাপনা, অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং যথাযথ ড্রেনেজ সিস্টেমের অভাবের কারণেই জলাবদ্ধতা ভয়াবহ রূপ নেয়। স্থানীয় সরকার ও সিটি করপোরেশন তখন অস্থায়ী পাম্পিং ব্যবস্থা চালু করলেও তা স্থায়ী সমাধান দিতে পারেনি।
নোয়াখালীবাসীর একটাই চাওয়া—এবার যেন স্থানীয় সরকার ও প্রশাসন কার্যকর পদক্ষেপ নেয়। বৃষ্টির আগে প্রস্তুতি ও দীর্ঘমেয়াদী পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন ছাড়া এই সমস্যা থেকে মুক্তি নেই।
“বিগত সরকারগুলো নোয়াখালীর ব্যাপারে সবসময় উদাসীন থেকেছে। আমরা চাই, এই উপেক্ষার রাজনীতি এবার শেষ হোক। সাধারণ মানুষের কথা শোনা হোক।” — রুহুল আমিন, সচেতন নাগরিক ফোরামের আহ্বায়ক
নোয়াখালীবাসীর আতঙ্ক এখন শুধুই প্রকৃতির নয়, বরং প্রশাসনিক উদাসীনতার ফলেও। প্রতিবছরের দুর্ভোগ যেন নতুন করে ঘুরে ফিরে আসে একই কারণে—প্রস্তুতির অভাব ও স্থায়ী সমাধানের অনুপস্থিতি। এখন সময় এসেছে কার্যকর পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের। তা না হলে, বৃষ্টি নামলেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়বে পুরো জেলায়—এটাই হবে নোয়াখালীর ভবিষ্যত বাস্তবতা।
