রাষ্ট্রপতির উপস্থিতিতে আজ যা ঘটেছে, আমরা বিব্রত: নাহিদ ইসলাম
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে ইতিহাস উপস্থাপন ও রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামের বক্তব্য। সংসদ সচিবালয়ে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির উপস্থিতিতে সংঘটিত ঘটনাগুলো বিব্রতকর এবং জাতীয় দিবস বা রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান এমনভাবে আয়োজন করা উচিত, যাতে সব রাজনৈতিক ও সামাজিক পক্ষ নিজেদের সমান অংশীদার মনে করতে পারে। তার বক্তব্যের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল একটি মৌলিক প্রশ্ন—গণঅভ্যুত্থানের মতো জাতীয় ঘটনার ইতিহাস কি রাষ্ট্রীয়ভাবে নিরপেক্ষ ও অন্তর্ভুক্তিমূলকভাবে তুলে ধরা হচ্ছে, নাকি তা রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অংশে পরিণত হচ্ছে?
প্রকাশিত বক্তব্য অনুযায়ী, নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে ঘিরে বিভাজনের চিত্র দেখা গেছে এবং রাষ্ট্রীয় আয়োজনে যদি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের বয়ান বা ন্যারেটিভ প্রাধান্য পায়, তাহলে অন্য রাজনৈতিক দল ও মতের মানুষের অংশগ্রহণের ক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে পড়ে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, গণঅভ্যুত্থানের কৃতিত্ব জনগণের এবং সেই ইতিহাস এমনভাবে উপস্থাপন করা প্রয়োজন, যাতে কোনো পক্ষ নিজেকে বঞ্চিত মনে না করে।
সাম্প্রতিক সময়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস, নেতৃত্ব, বিভিন্ন সংগঠনের ভূমিকা এবং রাষ্ট্রীয় স্মরণানুষ্ঠানকে ঘিরে একাধিক রাজনৈতিক দলের মধ্যে মতপার্থক্য প্রকাশ্যে এসেছে। বিভিন্ন দল অভিযোগ করেছে যে, সরকারি অনুষ্ঠান, প্রামাণ্যচিত্র কিংবা স্মরণসভায় আন্দোলনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, সংগঠন বা ঘটনাকে যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নি। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগের বিষয়ে যে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে বা দেওয়া হয়নি, তা এই প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই। ফলে নাহিদ ইসলামের বক্তব্যকে রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে দেখা উচিত; অভিযোগগুলোর স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ যাচাইয়ের জন্য অতিরিক্ত তথ্য প্রয়োজন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জাতীয় স্মৃতি নির্মাণ কেবল ইতিহাস সংরক্ষণের বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের বৈধতা, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি এবং সামাজিক ঐক্যের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। কোনো গণঅভ্যুত্থান বা জাতীয় আন্দোলনের ইতিহাস যদি একপাক্ষিকভাবে উপস্থাপিত হয়েছে বলে বড় অংশের অংশীজন মনে করেন, তাহলে সেই ইতিহাসকে ঘিরে দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এ কারণে রাষ্ট্রীয় স্মরণানুষ্ঠানে বহুমাত্রিক অংশগ্রহণ ও তথ্যভিত্তিক উপস্থাপনকে অনেক গবেষক গণতান্ত্রিক চর্চার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচনা করেন।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও একই ধরনের শিক্ষা দেয়। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদবিরোধী সংগ্রাম, পূর্ব ইউরোপে গণতান্ত্রিক রূপান্তর কিংবা লাতিন আমেরিকার সামরিক শাসন-পরবর্তী রাষ্ট্রগুলোতে জাতীয় স্মৃতি সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সরকার, বিরোধী দল, গবেষক, নাগরিক সমাজ এবং ভুক্তভোগীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। যদিও সব দেশে তা সমানভাবে সফল হয়নি, তবুও অন্তর্ভুক্তিমূলক ইতিহাসচর্চাকে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হয়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেও স্বাধীনতা যুদ্ধ, গণঅভ্যুত্থান এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাস কীভাবে উপস্থাপিত হবে, তা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিতর্ক হয়েছে। ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান, সরকারি প্রকাশনা, স্মারক নির্মাণ এবং শিক্ষাসামগ্রীতে ঐতিহাসিক বয়ানের পরিবর্তনের অভিযোগও নতুন নয়। ফলে জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে ঘিরে বর্তমান বিতর্ক বৃহত্তর ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার অংশ বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকদের একটি অংশ।
বিশ্লেষকদের মতে, জাতীয় দিবস বা রাষ্ট্রীয় স্মরণানুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত বিভাজন নয়, বরং সামাজিক সংহতি শক্তিশালী করা। যদি এসব অনুষ্ঠান নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধ বাড়তে থাকে, তাহলে গণঅভ্যুত্থানের যৌথ উত্তরাধিকার নিয়ে নতুন করে মেরুকরণ তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে সরকার, বিরোধী দল এবং আন্দোলনের অংশীজনদের মধ্যে সংলাপ ও সমন্বয়ের মাধ্যমে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক স্মরণচর্চা গড়ে উঠলে তা জাতীয় ঐক্যকে আরও সুদৃঢ় করতে পারে। ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানগুলো কীভাবে আয়োজন করা হবে এবং ইতিহাস উপস্থাপনের ক্ষেত্রে কতটা বহুমাত্রিকতা নিশ্চিত করা হবে, সেটিই এই বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।
