জুলাইর ঐক্য ফিরিয়ে আনতে মাহমুদুর রহমানের প্রতি জামায়াত আমিরের আহ্বান
জুলাই বিপ্লবের উত্তরাধিকার, সরকার ও বিরোধী দলের সম্পর্ক এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক ঐক্য—এই তিনটি বিষয়কে সামনে এনে জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান ‘আমার দেশ’-এর সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের প্রতি নতুন করে ঐক্য প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সম্মিলিত ত্যাগের মধ্য দিয়ে যে ঐক্য তৈরি হয়েছিল, তা বর্তমানে দুর্বল হয়ে পড়েছে। একই অনুষ্ঠানে মাহমুদুর রহমানও অভিযোগ করেন, জুলাই বিপ্লবের বর্ষপূর্তি সর্বদলীয়ভাবে উদযাপনের উদ্যোগ না নেওয়ায় রাজনৈতিক বিভাজন আরও দৃশ্যমান হয়েছে।
প্রকাশিত বক্তব্য অনুযায়ী, ডা. শফিকুর রহমানের মূল বার্তা ছিল রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঊর্ধ্বে উঠে জুলাই আন্দোলনের অংশীদারদের আবারও একত্রিত করা। তিনি সমানভাবে সব পক্ষের অবদান স্বীকার করার ওপর গুরুত্ব দেন এবং সহিংসতার ক্ষেত্রে দলীয় পরিচয়ের পরিবর্তে একই নৈতিক মানদণ্ড প্রয়োগের আহ্বান জানান। অন্যদিকে মাহমুদুর রহমানের বক্তব্যে সরকারকে জাতীয় ঐক্য গঠনে বেশি দায়িত্বশীল ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। তার মতে, সরকার উদ্যোগ নিলে বিরোধী দলগুলোরও ইতিবাচক সাড়া দেওয়া সহজ হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গণঅভ্যুত্থান বা বৃহৎ রাজনৈতিক আন্দোলনের পর সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি হলো আন্দোলনের সময়কার ঐক্যকে শান্তিকালীন রাজনৈতিক কাঠামোয় ধরে রাখা। ইতিহাসে দেখা গেছে, আন্দোলনের সময় বিভিন্ন আদর্শ, মতাদর্শ ও রাজনৈতিক দলের মধ্যে যে সমন্বয় তৈরি হয়, ক্ষমতার প্রশ্ন সামনে এলে সেই জোটে মতপার্থক্য ও প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে। ফলে আন্দোলনের যৌথ লক্ষ্য ধীরে ধীরে দলীয় রাজনৈতিক অবস্থানে রূপ নেয়, যা অনেক ক্ষেত্রে নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণের জন্ম দেয়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেও এ ধরনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন কিংবা জাতীয় সংকটের সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি একসঙ্গে অবস্থান নিলেও পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনা, নির্বাচন, সংবিধান সংস্কার, বিচার ও প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে ভিন্নমত প্রকাশ করেছে। ফলে আন্দোলনের ঐক্য এবং সরকার পরিচালনার বাস্তবতা এক বিষয় নয়—এটি রাজনৈতিক বিজ্ঞানেরও বহুল আলোচিত একটি বাস্তবতা।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে মাহমুদুর রহমান দাবি করেছেন, বর্ষপূর্তি উপলক্ষে একটি সর্বদলীয় কমিটি গঠন করা হলে কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা এড়ানো সম্ভব হতে পারত। তবে এই দাবির পক্ষে বা বিপক্ষে সরকারের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি। একইভাবে, তিনি বর্তমান রাজনৈতিক বয়ান ও বিভাজন নিয়ে যে মূল্যায়ন দিয়েছেন, তা তার ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক অবস্থান থেকে দেওয়া মতামত; এগুলো স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য তথ্য হিসেবে বিবেচিত নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জাতীয় স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত দিবসগুলো রাষ্ট্র কীভাবে পালন করবে, সেটি রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। অনেক গণতান্ত্রিক দেশে বড় জাতীয় আন্দোলন বা গণঅভ্যুত্থানের বার্ষিকী সরকার, বিরোধী দল, নাগরিক সমাজ ও ভুক্তভোগীদের অংশগ্রহণে উদযাপনের চেষ্টা করা হয়, যাতে ইতিহাস কোনো একক রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সম্পদে পরিণত না হয়। তবে বাস্তবে বিভিন্ন দেশে এ ধরনের উদ্যোগ সব সময় সফল হয় না এবং রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রায়ই ঐকমত্যকে দুর্বল করে।
এই বক্তব্যগুলোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, জুলাই আন্দোলনের উত্তরাধিকার নিয়ে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নিজেদের আন্দোলনের অন্যতম অংশীদার হিসেবে তুলে ধরছে এবং আন্দোলনের লক্ষ্য, অর্জন ও ভবিষ্যৎ কর্মসূচি নিয়ে পৃথক ব্যাখ্যা দিচ্ছে। এর ফলে জাতীয় স্মৃতি, রাষ্ট্রীয় বয়ান এবং রাজনৈতিক বৈধতার প্রশ্ন একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে।
দীর্ঘমেয়াদে এই বিতর্কের প্রভাব নির্ভর করবে রাজনৈতিক সংলাপ, পারস্পরিক আস্থা এবং সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার ওপর। যদি আন্দোলনের অংশীদারদের মধ্যে সমঝোতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, তাহলে জাতীয় ঐক্য শক্তিশালী হতে পারে। বিপরীতে, পারস্পরিক অবিশ্বাস ও বিভাজন আরও বাড়লে রাজনৈতিক মেরুকরণ গভীর হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। তাই জুলাই আন্দোলনের উত্তরাধিকার নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি বাস্তব নীতিগত উদ্যোগ, গণতান্ত্রিক সহনশীলতা এবং আইনভিত্তিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠাই আগামী সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
