বেরোবিতে শিবির-ছাত্রদলের সংঘর্ষে আহত ১০

রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষ দেশের বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতিতে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অনুমতিতে আয়োজিত 'জুলুমের বিরুদ্ধে জুলাই' শীর্ষক কর্মসূচিতে প্রদর্শিত একটি ব্যানারে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যুদ্ধাপরাধ মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত কয়েকজন জামায়াত নেতার ছবি থাকাকে কেন্দ্র করে দুই ছাত্রসংগঠনের মধ্যে প্রথমে বাকবিতণ্ডা এবং পরে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে উভয় পক্ষের অন্তত ১০ জন আহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ব্যক্তিরা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে বিভিন্ন সময়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন। কাদের মোল্লা, মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, মীর কাশেম আলী ও সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মৃত্যুদণ্ড পরে আপিলে আমৃত্যু কারাদণ্ডে পরিবর্তিত হলেও তিনি ২০২৩ সালে মৃত্যুবরণ করেন। এসব রায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কের বিষয় হলেও রাষ্ট্রীয় বিচারব্যবস্থার দৃষ্টিতে সেগুলো কার্যকর ও চূড়ান্ত বিচারিক সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত।

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক প্রতীক, ব্যানার কিংবা ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা নতুন নয়। অতীতেও দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পোস্টার, ব্যানার, স্মারক দিবস কিংবা রাজনৈতিক কর্মসূচিকে ঘিরে সহিংসতা ঘটেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভিন্নমতের সহাবস্থানের সংস্কৃতি দুর্বল হয়ে পড়লে ছোট একটি ইস্যুও দ্রুত সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয় আইন ও শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব মূলত বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ওপর থাকলেও ফৌজদারি অপরাধ সংঘটিত হলে দেশের প্রচলিত দণ্ডবিধি, ফৌজদারি কার্যবিধি এবং অন্যান্য প্রযোজ্য আইনের আওতায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যবস্থা নিতে পারে। পাশাপাশি প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব শৃঙ্খলা বিধিমালার আওতায় তদন্ত করে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে সতর্কীকরণ, সাময়িক বহিষ্কার বা স্থায়ী বহিষ্কারসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

ঘটনার পর উপাচার্য ড. মো. শওকাত আলী আহতদের চিকিৎসা সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন এবং ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি ক্যাম্পাসে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির সম্ভাবনা নিয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে তার বক্তব্যে উত্থাপিত তৃতীয় পক্ষের সম্পৃক্ততার বিষয়টি এখন পর্যন্ত স্বাধীনভাবে যাচাই হয়নি। এ বিষয়ে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো পক্ষের সংশ্লিষ্টতা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্ররাজনীতির নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। এর ফলে প্রভাব বিস্তার, কর্মসূচি পরিচালনা এবং রাজনৈতিক অবস্থান প্রকাশকে কেন্দ্র করে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকা, দ্রুত তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণ না হলে সংঘর্ষের পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি বাড়তে পারে।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সহিংসতা প্রতিরোধে স্পষ্ট আচরণবিধি, কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং বিরোধ নিষ্পত্তির প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শিক্ষাঙ্গনকে রাজনৈতিক সহিংসতার পরিবর্তে বিতর্ক, গবেষণা ও যুক্তিনির্ভর মতবিনিময়ের জায়গা হিসেবে ধরে রাখতে উন্নত শিক্ষাব্যবস্থাগুলো এসব ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দেয়।

স্বল্পমেয়াদে বেরোবির এই ঘটনার প্রভাব ক্যাম্পাসের শিক্ষা কার্যক্রম ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর পড়তে পারে। দীর্ঘমেয়াদে তদন্তের স্বচ্ছতা, প্রশাসনিক পদক্ষেপ এবং ছাত্রসংগঠনগুলোর আচরণই নির্ধারণ করবে ঘটনাটি একটি বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি এটি দেশের বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনার সূচনা করবে।

Next News Previous News