১০ দিনের সফরে যুক্তরাষ্ট্র যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী, পৌঁছবেন ২১ সেপ্টেম্বর
আগামী সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনে অংশ নিতে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের যুক্তরাষ্ট্র সফরের প্রস্তুতি চলছে বলে সরকারি ও দলীয় সূত্র জানিয়েছে। প্রাথমিক সূচি অনুযায়ী, ২১ সেপ্টেম্বর তার নিউইয়র্কে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। সফরকালে তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণ দিতে পারেন, বিভিন্ন রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করতে পারেন এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের একটি নাগরিক সংবর্ধনায় অংশ নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব জানিয়েছেন, সফরসূচি এখনো চূড়ান্ত হয়নি এবং এ বিষয়ে সরকারি প্রস্তুতি চলমান।
প্রতিবছর সেপ্টেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের অধিবেশন বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক আয়োজনগুলোর একটি। জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এই অধিবেশনে অংশ নিয়ে বৈশ্বিক নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন, অর্থনীতি, মানবাধিকার, সংঘাত এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নিয়ে নিজ নিজ দেশের অবস্থান তুলে ধরেন। এই অধিবেশন শুধু আনুষ্ঠানিক ভাষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর পাশাপাশি অসংখ্য দ্বিপক্ষীয় ও বহুপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে ভবিষ্যৎ সহযোগিতা ও কূটনৈতিক অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হয়।
এবারের অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে, কারণ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। এটি প্রায় চার দশক পর বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব ৮ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হবে এবং উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্কও সেপ্টেম্বরেই অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের সরকারপ্রধানের সম্ভাব্য এই সফরে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, জলবায়ু অর্থায়ন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, অভিবাসন, বিনিয়োগ, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং রোহিঙ্গা সংকটের মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পেতে পারে। তবে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো কোনো দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের তালিকা প্রকাশ করেনি। ফলে সম্ভাব্য বৈঠক বা আলোচ্যসূচি সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
সফরটি রাজনৈতিকভাবেও তাৎপর্যপূর্ণ। দীর্ঘ সময় পর যুক্তরাষ্ট্রে তারেক রহমানের সফরকে কেন্দ্র করে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। দলীয় সূত্রগুলো নিউইয়র্কে নাগরিক সংবর্ধনার প্রস্তুতির কথা বললেও, এর আনুষ্ঠানিক সময়সূচি এখনো প্রকাশ করা হয়নি। একই সময়ে সফরটি বাংলাদেশের নতুন সরকারের বৈদেশিক নীতি, আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক এবং বহুপাক্ষিক কূটনীতির অগ্রাধিকার তুলে ধরার সুযোগ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে মালয়েশিয়া ও চীন সফরে বাংলাদেশ শ্রমবাজার, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং অবকাঠামো সহযোগিতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে সমঝোতা ও চুক্তি করেছে বলে সরকার জানিয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় জাতিসংঘ অধিবেশনের ফাঁকে সম্ভাব্য বৈঠকগুলো অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এসব বিষয়ে কোনো নতুন সমঝোতা হবে কি না, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট বৈঠকের ফলাফল এবং পরবর্তী সরকারি ঘোষণার ওপর।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শুধু কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি আন্তর্জাতিক সমর্থন অর্জন, উন্নয়ন সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক বিভিন্ন ইস্যুতে নিজ দেশের অবস্থান তুলে ধরার অন্যতম কার্যকর মঞ্চ। ফলে বাংলাদেশের জন্যও এই সফর কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে সফরের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে অধিবেশনে উত্থাপিত বার্তা, অনুষ্ঠিত বৈঠক, সম্ভাব্য সমঝোতা এবং পরবর্তী বাস্তবায়নের ওপর।
