প্রথমবারের মতো চট্টগ্রাম সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথমবারের মতো চট্টগ্রাম সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আগামী ৯ আগস্ট বন্যাকবলিত হাটহাজারী, ফটিকছড়ি ও বাঁশখালী উপজেলা পরিদর্শনের কর্মসূচি চূড়ান্ত হয়েছে বলে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব জানিয়েছেন। সফরে তিনি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ, সরকারি উদ্যোগে নির্মিত নতুন ঘর হস্তান্তর এবং পুনর্নির্মিত ১০০টি বাড়ির চাবি উপকারভোগীদের হাতে তুলে দেওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন। প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে শুধু একটি প্রশাসনিক কর্মসূচি নয়, বরং দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসন কার্যক্রমের বাস্তব অগ্রগতি মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মুহূর্ত হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চল। পাহাড়ি ঢল, অতিবৃষ্টি, নদীর পানি বৃদ্ধি এবং অপরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার মিলিয়ে প্রায় প্রতি বছরই জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি তৈরি হয়। বিশেষ করে হাটহাজারী, ফটিকছড়ি ও বাঁশখালীতে অতিবৃষ্টি এবং পাহাড়ি ঢলের কারণে বসতবাড়ি, সড়ক, কৃষিজমি ও স্থানীয় অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার নজির রয়েছে। ফলে শুধু জরুরি ত্রাণ নয়, টেকসই পুনর্বাসন, নদী ও খাল ব্যবস্থাপনা, পানি নিষ্কাশন এবং দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

প্রধানমন্ত্রীর সফরের অন্যতম দিক হলো ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের হাতে নতুন ঘর এবং পুনর্নির্মিত বাড়ির চাবি হস্তান্তর। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, খাদ্য ও জরুরি সহায়তার পাশাপাশি দ্রুত নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করা ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার অন্যতম পূর্বশর্ত। তবে পুনর্বাসনের কার্যকারিতা নির্ভর করে ঘরের নির্মাণমান, নিরাপদ অবস্থান, বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক সুবিধা নিশ্চিত করার ওপর।

বাংলাদেশ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বন্যার ধরন ও তীব্রতা পরিবর্তিত হচ্ছে। অল্প সময়ে অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল এবং নদীভাঙনের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় শুধু ত্রাণনির্ভর ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, জলাধার ও খালের পুনরুদ্ধার এবং স্থানীয় পর্যায়ে দুর্যোগ-সহনশীল উন্নয়ন পরিকল্পনা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।

প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের রাজনৈতিক গুরুত্বও রয়েছে। দায়িত্ব গ্রহণের পর কোনো অঞ্চলে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম সফর সাধারণত সরকারের অগ্রাধিকার, প্রশাসনিক সক্রিয়তা এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে থাকার বার্তা বহন করে। দুর্যোগকবলিত এলাকায় সরাসরি উপস্থিতি স্থানীয় প্রশাসনের তৎপরতা বাড়ানোর পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের প্রয়োজন সম্পর্কে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রত্যক্ষ ধারণা অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি করে। একই সঙ্গে ঘোষিত পুনর্বাসন ও পুনর্গঠন কর্মসূচি বাস্তবায়নের অগ্রগতিও জনসম্মুখে মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হয়।

প্রশাসনিক প্রস্তুতির পাশাপাশি স্থানীয় রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর প্রস্তুতির খবরও পাওয়া গেছে। তবে দুর্যোগ-পরবর্তী সরকারি সফরের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া, যাতে ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার পরিবর্তে জনসেবামূলক কার্যক্রম হিসেবে পরিচালিত হয়। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্ষয়ক্ষতির সঠিক মূল্যায়ন, স্বচ্ছ উপকারভোগী নির্বাচন এবং পুনর্বাসন সহায়তার জবাবদিহি নিশ্চিত করা হলে সরকারি উদ্যোগের প্রতি জনআস্থা আরও বৃদ্ধি পায়।

বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর সফরের কর্মসূচিতে ত্রাণ বিতরণ, পুনর্নির্মিত ঘর হস্তান্তর এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে সফরে নতুন কোনো আর্থিক সহায়তা প্যাকেজ, অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প বা দীর্ঘমেয়াদি বন্যা প্রতিরোধ পরিকল্পনা ঘোষণা করা হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। ফলে সফরের তাৎপর্য শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হবে ঘোষিত কর্মসূচির বাস্তবায়ন, পুনর্বাসনের গতি এবং ভবিষ্যৎ দুর্যোগ মোকাবিলায় গৃহীত নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর।

Next News Previous News