অস্ত্রের মুখেও থামেনি আন্দোলন, ঘোষণা আসে ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি একদিন এগিয়ে আনার

২০২৪ সালের ৪ আগস্ট, যা আন্দোলনকারীদের মধ্যে ‘৩৫ জুলাই’ নামে পরিচিত, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিন হিসেবে আলোচিত। এদিন সরকার পতনের এক দফা দাবিতে চলমান অসহযোগ আন্দোলন নতুন মোড়ে পৌঁছায়। দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ, প্রাণহানি, কারফিউ জারি এবং রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই আন্দোলনের নেতৃত্ব ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ৬ আগস্ট থেকে একদিন এগিয়ে ৫ আগস্ট পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে এই সিদ্ধান্তকে আন্দোলনের কৌশলগত মোড় হিসেবে বিবেচনা করেন বহু রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

জুলাই মাসে শুরু হওয়া কোটা সংস্কার আন্দোলন ধীরে ধীরে সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে রূপ নেয়। আন্দোলনের সময় বিভিন্ন স্থানে সহিংস সংঘর্ষ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান, প্রাণহানি এবং ব্যাপক গ্রেপ্তারের ঘটনা দেশজুড়ে অস্থিরতা তৈরি করে। তৎকালীন সরকার আন্দোলনের মধ্যে সহিংস গোষ্ঠী ও রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতার অভিযোগ তোলে এবং পরিস্থিতিকে ‘জঙ্গি হামলা’ হিসেবে বর্ণনা করে। বিপরীতে আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করেন, তাদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করা হয়েছে এবং রাজনৈতিক দাবিকে দমন করতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করা হয়েছে। এসব অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের বিষয়ে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন তদন্ত, বিচারিক প্রক্রিয়া এবং মানবাধিকার সংস্থার মূল্যায়ন শুরু হলেও সব ঘটনার চূড়ান্ত আইনি নিষ্পত্তি এখনো সম্পন্ন হয়নি।

৪ আগস্ট দেশের বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে এবং বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখযোগ্য প্রাণহানির তথ্য প্রকাশিত হয়। একই দিনে সরকার অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ জারি এবং কয়েক দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপগুলোর উদ্দেশ্য ছিল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা, যদিও আন্দোলনকারীরা এগুলোকে গণআন্দোলন দমনের অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। পরিস্থিতির দ্রুত অবনতির ফলে রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরে স্বাভাবিক জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।

এই প্রেক্ষাপটে আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সিদ্ধান্ত ছিল ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির সময় পরিবর্তন। প্রথমে ৬ আগস্ট কর্মসূচি ঘোষিত হলেও আন্দোলনের সমন্বয়কদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন সূত্র থেকে তারা আশঙ্কার তথ্য পান যে অতিরিক্ত সময় পেলে সরকার আন্দোলন দমনে আরও কঠোর অভিযান চালাতে পারে। এই মূল্যায়নের ভিত্তিতেই কর্মসূচি একদিন এগিয়ে আনার বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়। তবে সরকার কখন বা কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল—এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাইকৃত সরকারি নথি বা আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশিত হয়নি। ফলে সম্ভাব্য পরিকল্পনার বিষয়টি মূলত আন্দোলনের নেতাদের দাবি ও মূল্যায়নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক আব্দুল কাদের, মাহিন সরকার এবং আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াসহ একাধিক নেতা পরবর্তী সময়ে সাক্ষাৎকারে বলেছেন, কর্মসূচি এগিয়ে আনার সিদ্ধান্ত আন্দোলনের নিরাপত্তা ও গতি বজায় রাখার জন্য নেওয়া হয়েছিল। তাদের দাবি, দীর্ঘসূত্রতা সৃষ্টি হলে আন্দোলনের নেতৃত্ব ও অংশগ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে আরও বড় ধরনের অভিযান পরিচালিত হতে পারত। তবে এ ধরনের মূল্যায়ন আন্দোলনের নেতৃত্বের বক্তব্য; এ বিষয়ে স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত প্রকাশিত হয়নি।

এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন এবং সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সমন্বয়ের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল এবং ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতারা পরবর্তী সময়ে জানান, কর্মসূচির সময় পরিবর্তন নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে আলোচনা হয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত অধিকাংশ অংশীজন দ্রুত কর্মসূচি পালনের পক্ষে মত দেন। রাজনৈতিক বিজ্ঞানীদের মতে, বৃহৎ গণআন্দোলনে বিভিন্ন সংগঠনের মধ্যে কৌশলগত সমন্বয় আন্দোলনের সফলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, কারণ এটি নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সাংগঠনিক সক্ষমতা বাড়ায়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গণআন্দোলনের সময় কর্মসূচির সময়সূচি পরিবর্তনের নজির নতুন নয়। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং পরবর্তী বিভিন্ন গণআন্দোলনেও মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি বিবেচনায় কৌশল পরিবর্তনের উদাহরণ দেখা গেছে। ইতিহাসবিদদের মতে, সফল গণআন্দোলনে নেতৃত্বকে প্রায়ই দ্রুত পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয় এবং অনেক সময় সেই সিদ্ধান্তই আন্দোলনের গতিপথ নির্ধারণ করে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা, জাতিসংঘের বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ এবং বিদেশি গণমাধ্যম ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাবলি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। তারা প্রাণহানি, অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানায়। অন্যদিকে তৎকালীন সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সহিংসতা প্রতিরোধের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করে।

৪ আগস্ট সেনাবাহিনীর সাবেক কয়েকজন কর্মকর্তার পক্ষ থেকেও সশস্ত্র বাহিনীকে জনতার মুখোমুখি না দাঁড়ানোর আহ্বান জানানো হয়। যদিও এটি কোনো সরকারি বা সামরিক নীতিগত সিদ্ধান্ত ছিল না, তবুও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সেই সময়ের সামগ্রিক জনমত ও রাজনৈতিক আলোচনায় এ ধরনের বক্তব্যের প্রতীকী গুরুত্ব ছিল।

পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে ৫ আগস্ট রাজধানীমুখী ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে পরিণত হয়। তবে ইতিহাসবিদদের মতে, একটি মাত্র সিদ্ধান্ত নয়; বরং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, আন্দোলনের বিস্তার, জনসমর্থন, রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়া, বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির অবস্থান এবং ধারাবাহিক ঘটনাবলির সম্মিলিত প্রভাবে পরবর্তী পরিবর্তন ঘটে। ফলে ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি একদিন এগিয়ে আনার সিদ্ধান্তকে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত মোড় হিসেবে বিবেচনা করা হলেও, সেটিকে একক কারণ হিসেবে ব্যাখ্যা করা ইতিহাসের পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে না।

Next News Previous News