দেশে ফিরে যা বললেন ইলিয়াস কাঞ্চন
দীর্ঘ দেড় বছরেরও বেশি সময় যুক্তরাজ্যে চিকিৎসা গ্রহণের পর দেশের মাটিতে ফিরেছেন বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেতা, একুশে পদকপ্রাপ্ত ব্যক্তিত্ব এবং নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের অন্যতম মুখ ইলিয়াস কাঞ্চন। দেশে ফিরে তিনি নিজের শারীরিক অবস্থার উন্নতির কথা জানিয়ে সবার কাছে দোয়া কামনা করেছেন। তার এই প্রত্যাবর্তন শুধু একজন জনপ্রিয় অভিনেতার দেশে ফেরা নয়; বরং এটি গুরুতর রোগের চিকিৎসা, জনজীবনে পরিচিত ব্যক্তিদের স্বাস্থ্যসংকট এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের গুরুত্ব নিয়েও নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে।
ইলিয়াস কাঞ্চন ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত হওয়ার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যে যান। সেখানে তার মস্তিষ্কে জটিল অস্ত্রোপচার করা হলেও চিকিৎসকদের মূল্যায়নে টিউমারের সম্পূর্ণ অংশ অপসারণ সম্ভব হয়নি। পরবর্তী সময়ে দীর্ঘ সময় ধরে তাকে কেমোথেরাপি নিতে হয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে অনেক ধরনের ব্রেন টিউমারের ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচার, রেডিওথেরাপি ও কেমোথেরাপির সমন্বিত চিকিৎসা প্রয়োজন হয় এবং রোগীর বয়স, টিউমারের ধরন, অবস্থান ও বিস্তারের ওপর চিকিৎসার ফলাফল নির্ভর করে। আন্তর্জাতিক চিকিৎসা নির্দেশিকা অনুযায়ী, অস্ত্রোপচারের পরও নিয়মিত এমআরআই পরীক্ষা, বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধান এবং দীর্ঘমেয়াদি ফলো-আপ চিকিৎসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, মস্তিষ্ক ও কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের টিউমার তুলনামূলকভাবে কম দেখা গেলেও এটি সবচেয়ে জটিল রোগগুলোর একটি। রোগটি শনাক্ত হওয়ার পর দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা গেলে অনেক ক্ষেত্রেই রোগীর জীবনমান উন্নত রাখা সম্ভব হয়। তবে টিউমারের ধরন ভেদে চিকিৎসার সময়কাল কয়েক মাস থেকে কয়েক বছর পর্যন্ত দীর্ঘ হতে পারে। অনেক রোগীকে অস্ত্রোপচারের পর পুনর্বাসন, শারীরিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধার এবং মানসিক সহায়তার মধ্য দিয়েও যেতে হয়।
বাংলাদেশে উচ্চপ্রযুক্তির নিউরোসার্জারি এবং ক্যানসার চিকিৎসার সক্ষমতা আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেলেও জটিল কিছু ক্ষেত্রে এখনো অনেক রোগী বিদেশে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হন। বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, নিউরো-অনকোলজি, উন্নত রেডিওথেরাপি প্রযুক্তি, গবেষণা এবং বহুমাত্রিক চিকিৎসা ব্যবস্থার আরও সম্প্রসারণ প্রয়োজন। একই সঙ্গে রোগ নির্ণয়ের আধুনিক সুবিধা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছে দেওয়া গেলে বিদেশমুখী রোগীর সংখ্যা কমতে পারে।
ইলিয়াস কাঞ্চনের পরিচয় শুধু একজন জনপ্রিয় অভিনেতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কয়েক দশকের চলচ্চিত্রজীবনে তিনি অসংখ্য দর্শকপ্রিয় সিনেমায় অভিনয় করেছেন, যার মধ্যে 'বেদের মেয়ে জোছনা' বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম ব্যবসাসফল ছবি হিসেবে বিবেচিত। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জনের পাশাপাশি তিনি স্ত্রী জাহানারা কাঞ্চনের সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর পর নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে যুক্ত হয়ে সামাজিক নেতৃত্বের একটি অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেন। তার প্রতিষ্ঠিত 'নিরাপদ সড়ক চাই' আন্দোলন সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে এবং এই অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি একুশে পদকে ভূষিত হন।
জনপরিচিত ব্যক্তিদের গুরুতর অসুস্থতা প্রায়ই সমাজে স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়াতে ভূমিকা রাখে। চিকিৎসকরা মনে করেন, দীর্ঘদিন মাথাব্যথা, খিঁচুনি, দৃষ্টিশক্তির পরিবর্তন, ভারসাম্যহীনতা বা আচরণগত অস্বাভাবিকতার মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। কারণ অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত রোগ শনাক্ত করা গেলে চিকিৎসার সফলতার সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পায়।
ইলিয়াস কাঞ্চনের দেশে ফেরা তার ভক্ত, সহকর্মী এবং শুভানুধ্যায়ীদের জন্য স্বস্তির খবর হলেও চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি চিকিৎসার সমাপ্তি নির্দেশ করে না। ব্রেন টিউমারের রোগীদের অনেক সময় দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ, নিয়মিত পরীক্ষা এবং পুনরায় চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে। ফলে ভবিষ্যতেও তার স্বাস্থ্য পরিস্থিতি চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণের আওতায় থাকবে বলেই চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রচলিত বাস্তবতা নির্দেশ করে।
বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, ইলিয়াস কাঞ্চনের দেশে ফেরা এবং তার শারীরিক অবস্থার উন্নতির বিষয়টি নিশ্চিত হলেও ভবিষ্যতের চিকিৎসা পরিকল্পনা, পরবর্তী ফলো-আপ বা কর্মজীবনে পূর্ণমাত্রায় ফেরার সময়সূচি সম্পর্কে বিস্তারিত কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশিত হয়নি। তাই এ বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত কোনো ধরনের অনুমান করা সমীচীন নয়। তবে তার সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সংবাদ বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গন, সামাজিক আন্দোলন এবং অসংখ্য ভক্তের জন্য ইতিবাচক বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
