হালাল পণ্যের বৈশ্বিক বাজার ধরতে চায় বাংলাদেশ
বাংলাদেশের হালাল শিল্পের বিকাশ এবং বৈশ্বিক বাজারে দেশের অবস্থান শক্তিশালী করতে মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরে দেশটির প্রধানমন্ত্রী সঙ্গে বৈঠকে এবং এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সফরেও হালাল শিল্পে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রায় ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক হালাল বাজারে বাংলাদেশের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষাগার, একক সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা এবং আধুনিক অবকাঠামোর অভাব এ খাতের প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
হালাল শিল্প কী?
হালাল শিল্প কেবল খাদ্য উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। এতে খাদ্য, পানীয়, ওষুধ, প্রসাধনী, ব্যাংকিং, পর্যটন, হোটেল, লজিস্টিকসসহ মোট নয়টি খাত অন্তর্ভুক্ত। কাঁচামাল সংগ্রহ থেকে উৎপাদন, সংরক্ষণ, পরিবহন ও ভোক্তার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে ইসলামী শরিয়াহসম্মত মান বজায় রাখাই এ শিল্পের মূল বৈশিষ্ট্য।
মালয়েশিয়ার সফল মডেল
হালাল শিল্পে মালয়েশিয়াকে বিশ্বের অন্যতম সফল মডেল হিসেবে ধরা হয়। ১৯৭০-এর দশক থেকে দেশটি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন হালাল সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। দেশটির সরকারি সংস্থা জাকিম (JAKIM) হালাল সনদ প্রদান করে এবং হালাল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন (HDC) শিল্পের উন্নয়নে কাজ করছে।
মালয়েশিয়ার পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশটির হালাল শিল্পের বাজার ১১৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে। এর মধ্যে খাদ্য ও পানীয় খাতের বাজারই হবে প্রায় ৮৫ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে দেশটির হালাল খাদ্য আমদানির পরিমাণ ৫০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের সম্ভাবনা
মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হওয়ায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও হালাল পণ্যের চাহিদা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। বর্তমানে দেশের হালাল পণ্য রপ্তানির পরিমাণ প্রায় ৮৫ কোটি ডলার, যার বড় অংশই কৃষিপণ্য।
ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও আন্তর্জাতিক মানের সনদ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে শুধু মালয়েশিয়ার বাজারেই বাংলাদেশ কয়েক বিলিয়ন ডলারের খাদ্যপণ্য রপ্তানি করতে সক্ষম হবে।
প্রধান চ্যালেঞ্জ
বর্তমানে বাংলাদেশে বিএসটিআই এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশন পৃথকভাবে হালাল সনদ প্রদান করছে। একাধিক সংস্থার মাধ্যমে সনদ দেওয়ার কারণে ব্যবসায়ীদের জন্য জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষাগারের অভাব, সীমিত পরীক্ষণ সক্ষমতা এবং আধুনিক জবাই ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থার ঘাটতির কারণে বাংলাদেশের মাংস ও মাংসজাত পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে প্রত্যাশিতভাবে প্রবেশ করতে পারছে না। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানকে বিদেশি সংস্থা, বিশেষ করে মালয়েশিয়ার জাকিমের কাছ থেকে হালাল সনদ সংগ্রহ করতে হচ্ছে।
উন্নয়নের পথ
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষাগার প্রতিষ্ঠা, একক ও গ্রহণযোগ্য সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা চালু এবং একটি বিশেষ ‘হালাল অর্থনৈতিক অঞ্চল’ গড়ে তুলতে পারলে এ খাতের বিকাশ ত্বরান্বিত হবে।
এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ইতোমধ্যে মালয়েশিয়ার হালাল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশনের সঙ্গে কাজ শুরু করেছে। পাশাপাশি আগামী মার্চে সংশ্লিষ্ট সমস্যা চিহ্নিত করে সরকারের কাছে সুপারিশ তুলে ধরতে একটি বিশেষ সম্মেলনেরও প্রস্তুতি চলছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করা গেলে হালাল শিল্প ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রপ্তানি আয়, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে।
