আমরা এখনো জুলাই আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ পাইনি: নাহিদ ইসলাম
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে মাসব্যাপী ‘দেশ গড়তে জুলাই জাগরণ’ কর্মসূচির সূচনা করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। রাজধানীর রায়েরবাজারে জুলাইয়ের শহীদদের গণকবর জিয়ারতের মধ্য দিয়ে কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। এ সময় দলটির নেতারা গণঅভ্যুত্থানের চেতনা বাস্তবায়ন, বিচারপ্রক্রিয়ার গতি বৃদ্ধি এবং কাঠামোগত সংস্কারের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন।
কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে যে বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখা হয়েছিল, দুই বছর পরও সেই লক্ষ্য পুরোপুরি অর্জিত হয়নি। তার ভাষায়, গণঅভ্যুত্থানের পর বিচার ও সংস্কারের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, বাস্তবতায় তার অনেক কিছুই এখনও অপূর্ণ রয়ে গেছে।
সংস্কার বাস্তবায়নে সরকারের প্রতি আহ্বান
নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম অঙ্গীকার ছিল রাষ্ট্রীয় সংস্কার এবং গণভোটে প্রতিফলিত জনমতের বাস্তবায়ন। কিন্তু এখনো কাঠামোগত পরিবর্তনের অনেক ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, শুধু আনুষ্ঠানিকভাবে জুলাই স্মরণ করলেই হবে না; আন্দোলনের মূল লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে হবে। বিশেষ করে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সংস্কার, জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা এবং বৈষম্য দূরীকরণের বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
ইনুর রায়ে অসন্তোষ
সাম্প্রতিক এক মামলায় জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে ঘোষিত রায় নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন এনসিপি নেতা। তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনের সময় সংঘটিত অপরাধে ইনুর বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো প্রমাণিত হয়েছে, তার তুলনায় ঘোষিত সাজা যথেষ্ট নয় বলে তাদের দল মনে করে।
নাহিদ ইসলাম দাবি করেন, রাষ্ট্রপক্ষের উচিত রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে অধিকতর কঠোর শাস্তি নিশ্চিতের উদ্যোগ নেওয়া। একই সঙ্গে জুলাই আন্দোলনসংক্রান্ত অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ মামলার বিচার দ্রুত সম্পন্ন করারও আহ্বান জানান তিনি।
শেখ হাসিনাসহ অভিযুক্তদের বিচারের দাবি
এনসিপি আহ্বায়ক বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্ত এবং দেশের বাইরে অবস্থানরত ব্যক্তিদের দেশে ফিরিয়ে এনে বিচার প্রক্রিয়ার আওতায় আনা প্রয়োজন। তার মতে, বিচারপ্রক্রিয়ার দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর মধ্যে হতাশা বাড়তে পারে।
তিনি আরও বলেন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা শুধু অতীতের ঘটনার বিচার নয়; বরং ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধের জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ।
শহীদ ও অংশগ্রহণকারীদের প্রতি শ্রদ্ধা
কর্মসূচিতে জুলাই আন্দোলনে নিহত ও আহতদের স্মরণ করেন এনসিপির নেতারা। নাহিদ ইসলাম বলেন, আন্দোলনের সাফল্যের পেছনে বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, মাদ্রাসা ও স্কুলের শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী মানুষ, নারী, শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, সাংস্কৃতিক কর্মী, প্রবাসী বাংলাদেশি এবং বিভিন্ন পেশাজীবী শ্রেণির অবদান রয়েছে।
তিনি উল্লেখ করেন, গণঅভ্যুত্থান কোনো একক ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর অর্জন নয়; বরং এটি ছিল দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সম্মিলিত আন্দোলন। তাই এর চেতনা ও মূল্যবোধ ধরে রাখতে জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজন রয়েছে।
জুলাই জাদুঘর দ্রুত চালুর দাবি
এনসিপির পক্ষ থেকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানভিত্তিক জাতীয় জাদুঘর দ্রুত জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করারও দাবি জানানো হয়। দলটির নেতারা মনে করেন, আন্দোলনের ইতিহাস, স্মৃতি ও ত্যাগের দলিল সংরক্ষণে এ ধরনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছে। এর মধ্য দিয়ে বিচার, সংস্কার এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার প্রশ্ন আবারও জাতীয় রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে।
সূত্র: আমার দেশ
