জুয়া প্রতিরোধ নিয়ে নতুন আইন পাস, অনলাইন বেটিংয়ে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড

বাংলাদেশে জুয়া, অনলাইন বেটিং এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মভিত্তিক জুয়ার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে জাতীয় সংসদে ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন-২০২৬’ পাস হয়েছে। নতুন এই আইনে অনলাইন বেটিং, ম্যাচ ফিক্সিং, ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে জুয়ার লেনদেনসহ আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন অপরাধকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অপরাধের ধরন অনুযায়ী কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় ধরনের শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে, যার মধ্যে সর্বোচ্চ অর্থদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ কোটি টাকা।

মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিলটি উত্থাপন করলে তা সর্বসম্মতভাবে কণ্ঠভোটে পাস হয়। স্পিকার হাফিজউদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে আইনটি অনুমোদন পায়।

কেন নতুন আইন প্রয়োজন হলো?

আইনের উদ্দেশ্য ও কারণ-সংবলিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এতদিন দেশে জুয়া সংক্রান্ত অপরাধ মোকাবিলায় ১৮৬৭ সালের ‘দ্য পাবলিক গ্যাম্বলিং অ্যাক্ট’ কার্যকর ছিল। তবে ডিজিটাল যুগে অনলাইন ক্যাসিনো, স্পোর্টস বেটিং, ভার্চুয়াল গেমিং, ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং আন্তর্জাতিক জুয়ার প্ল্যাটফর্মের বিস্তারের কারণে পুরোনো আইন কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে।

সরকারের মতে, অনলাইন জুয়া এখন শুধু সামাজিক সমস্যা নয়; এটি অর্থপাচার, সাইবার অপরাধ এবং তরুণ সমাজের জন্যও বড় ঝুঁকি হয়ে উঠেছে। ফলে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ মোকাবিলায় নতুন আইন প্রণয়ন জরুরি হয়ে পড়ে।

কোন অপরাধে কত শাস্তি?

নতুন আইনে সাধারণ জুয়ার জন্য সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড অথবা দুই লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। তবে অনলাইন বা দূরবর্তী জুয়ার ক্ষেত্রে শাস্তি আরও কঠোর।

অনলাইন জুয়ার জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড ও এক কোটি টাকা জরিমানা, আর অনলাইন বেটিংয়ের জন্য সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড এবং পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

জুয়ার আসর পরিচালনা বা জুয়ার জন্য কোনো স্থাপনা ব্যবহারের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সম্পত্তি, যানবাহন, সার্ভার বা অবকাঠামো বাজেয়াপ্ত করা যাবে।

ম্যাচ ফিক্সিং ও বিজ্ঞাপনেও কঠোর ব্যবস্থা

আইনে ম্যাচ ফিক্সিংকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। ম্যাচ ফিক্সিংয়ে জড়িতদের সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড ও এক কোটি টাকা জরিমানা করা যাবে। স্পট ফিক্সিংয়ের ক্ষেত্রে শাস্তি হতে পারে পাঁচ বছর কারাদণ্ড এবং ৫০ লাখ টাকা জরিমানা।

এছাড়া জুয়ার বিজ্ঞাপন, স্পন্সরশিপ, অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং, রেফারেল ক্যাম্পেইন কিংবা বিভ্রান্তিকর প্রচারণায় অংশ নিলে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, ইনফ্লুয়েন্সার, শিল্পী বা ক্রীড়াবিদদের বিরুদ্ধে তিন বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ডিজিটাল লেনদেন নজরদারিতে

আইনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, ব্যাংক হিসাব, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস), ডিজিটাল ওয়ালেট, হাওলা, হুন্ডি কিংবা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে জুয়ার অর্থ লেনদেন বা গোপন করার চেষ্টা করলে তা মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের আওতায় অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

আদালত প্রয়োজন হলে অভিযুক্তদের ব্যাংক হিসাব, এমএফএস অ্যাকাউন্ট, ডিজিটাল ওয়ালেট এবং ক্রিপ্টো ওয়ালেট সাময়িকভাবে জব্দ বা ফ্রিজ করার নির্দেশ দিতে পারবেন।

ওয়েবসাইট ও অ্যাপ বন্ধ করার ক্ষমতা

নতুন আইনের আওতায় সরকার বা নির্ধারিত কর্তৃপক্ষ জনস্বার্থে জুয়া ও বেটিং-সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইট, মোবাইল অ্যাপ, সার্ভার, ডোমেইন, আইপি অ্যাড্রেস, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজ বা গ্রুপ বন্ধ কিংবা নিষিদ্ধ করতে পারবে।

পাশাপাশি জুয়ার অর্থ লেনদেনে ব্যবহৃত ব্যাংক হিসাব, এমএফএস অ্যাকাউন্ট, পেমেন্ট গেটওয়ে ও ক্রিপ্টো ওয়ালেটও বন্ধ করার ক্ষমতা আদালতকে দেওয়া হয়েছে।

জাতীয় পর্যায়ে নজরদারি ব্যবস্থার পরিকল্পনা

আইন বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে জাতীয় ডিজিটাল ব্ল্যাকলিস্ট ডেটাবেজ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে। এছাড়া এনআইডি, সিম ও এমএফএস অ্যাকাউন্ট সংযুক্তকরণ, বায়োমেট্রিক ও ফেসিয়াল রিকগনিশনভিত্তিক যাচাই ব্যবস্থা চালুর কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

জুয়া, বেটিং, অর্থপাচার ও সংশ্লিষ্ট অপরাধ প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা এবং বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে একটি আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স গঠনের বিধান রাখা হয়েছে।

কী বার্তা দিচ্ছে নতুন আইন?

বিশেষজ্ঞদের মতে, অনলাইন জুয়া ও বেটিং প্ল্যাটফর্মের বিস্তার ঠেকাতে আইনটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে অনলাইন বেটিংয়ের প্রবণতা এবং ডিজিটাল মাধ্যমে অর্থপাচারের ঝুঁকি মোকাবিলায় এটি একটি শক্তিশালী আইনি কাঠামো তৈরি করবে।

তবে আইনটির সফল প্রয়োগ নির্ভর করবে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, আন্তঃসংস্থার সমন্বয় এবং আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করার ওপর।

সূত্র: জাতীয় সংসদের কার্যবিবরণী ও সংশ্লিষ্ট সরকারি তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত।

Next News Previous News