জামায়াতের সঙ্গে ‘বন্ধুত্ব করতে চায়’ যুক্তরাষ্ট্র

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে আগ্রহ দেখিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র—এমন তথ্য উঠে এসেছে প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকায় কর্মরত একজন মার্কিন কূটনীতিক এক নারী সাংবাদিকের সঙ্গে আলাপকালে জামায়াতের সঙ্গে ‘বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক’ গড়ার ইচ্ছার কথা প্রকাশ করেছেন। এই কথোপকথনের একটি অডিও রেকর্ডের ভিত্তিতেই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে।

ওয়াশিংটন পোস্ট জানায়, ওই অডিওতে কূটনীতিককে বলতে শোনা যায়—বাংলাদেশের রাজনীতি ধীরে ধীরে ইসলামপন্থার দিকে ঝুঁকছে এবং আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী তাদের ইতিহাসের সর্বোচ্চ সংখ্যক আসন পেতে পারে। এই বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্র জামায়াতের সঙ্গে যোগাযোগ ও সম্পর্ক রাখতে আগ্রহী।

নির্বাচন ও ইসলামপন্থি রাজনীতির প্রসঙ্গ

প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন কূটনীতিক উল্লেখ করেন যে, অতীতে একাধিকবার নিষিদ্ধ হওয়া দল জামায়াতে ইসলামী ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি হয়ে উঠতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র চায়, দলটির সঙ্গে তাদের যোগাযোগের একটি কার্যকর চ্যানেল থাকুক। “আমরা চাই তারা আমাদের বন্ধু হোক”—অডিওতে এমন মন্তব্য শোনা যায় বলে জানিয়েছে ওয়াশিংটন পোস্ট।

আলাপকালে ওই কূটনীতিক সাংবাদিককে ছাত্রশিবিরের নেতাদের টেলিভিশন আলোচনায় আমন্ত্রণ জানানো সম্ভব কি না, সে প্রশ্নও তোলেন। এতে বোঝা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ইসলামপন্থি রাজনৈতিক শক্তিগুলোর অবস্থান ও প্রভাব সম্পর্কে ঘনিষ্ঠভাবে ধারণা নিতে আগ্রহী।

শরীয়াহ আইন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, জামায়াত ক্ষমতায় এলে বাংলাদেশে শরীয়াহ আইন চালু হবে কি না—এমন উদ্বেগের জবাবে ওই কূটনীতিক দাবি করেন, জামায়াত এমন সিদ্ধান্ত নেবে না। তার মতে, বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক চাপের বাস্তবতা দলটিকে এমন পদক্ষেপ থেকে বিরত রাখবে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি বাংলাদেশে শরীয়াহ আইন চালু করা হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র তাৎক্ষণিকভাবে কঠোর বাণিজ্যিক ব্যবস্থা নিতে পারে। বিশেষ করে পোশাক খাতে ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের মতো সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বড় ধাক্কায় ফেলবে। তিনি উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের মোট রপ্তানির একটি বড় অংশ পোশাক শিল্পনির্ভর।

জামায়াত ছাড়াও অন্যান্য ইসলামি দলের প্রসঙ্গ

ওই কূটনীতিক জানান, যুক্তরাষ্ট্র কেবল জামায়াতের সঙ্গেই নয়, ভবিষ্যতে হেফাজতে ইসলাম ও ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশের মতো অন্যান্য ইসলামপন্থি সংগঠনের সঙ্গেও যোগাযোগ করতে পারে। তার ভাষায়, এসব দলের সঙ্গে যোগাযোগ থাকলে যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনে সরাসরি তাদের অবস্থান জানাতে পারবে।

মার্কিন দূতাবাস ও জামায়াতের প্রতিক্রিয়া

এ বিষয়ে ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের মুখপাত্র মোনিকা শিই ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেন, আলোচনাটি গত ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং এটি ছিল সাংবাদিকদের সঙ্গে দূতাবাস কর্মকর্তাদের নিয়মিত অনানুষ্ঠানিক বৈঠকের অংশ। তিনি জানান, এসব আলোচনা সাধারণত প্রকাশের জন্য নয় এবং এটি ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কেও কোনো প্রভাব ফেলবে না।

অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর মুখপাত্র মোহাম্মদ রহমান জানান, ব্যক্তিগত কূটনৈতিক আলোচনার বিষয়ে তারা মন্তব্য করেন না। তবে তিনি স্বীকার করেন, ২০২৪ সালে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে ওয়াশিংটনে জামায়াত ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের মধ্যে অন্তত চারটি বৈঠক হয়েছে। ঢাকায়ও একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং সর্বশেষ যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জ্যামিসন গ্রেয়ারের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠক হয়েছে।

আঞ্চলিক রাজনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব

আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সম্পর্ক এমনিতেই চ্যালেঞ্জের মুখে। এর মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠতা ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে নতুন জটিলতা তৈরি করতে পারে।

তার মতে, বাংলাদেশে ভারতের দীর্ঘদিনের একটি বড় উদ্বেগ হলো জামায়াত। ভারত দলটিকে পাকিস্তানঘেঁষা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের এই কূটনৈতিক কৌশল দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।

Source: Based on reporting from Dhaka Post and The Washington Post

Next Post Previous Post

Advertisement