গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে নতুন স্বপ্নের সূচনা হলেও দেশ হোঁচট খাচ্ছে
একটি গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে নতুন প্রত্যাশার সূচনা হলেও বাস্তবতার কঠিন চ্যালেঞ্জে দেশ হোঁচট খাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। তার মতে, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শাসনে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার না হওয়ায় সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ কমে যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতের জন্য উদ্বেগজনক ইঙ্গিত বহন করে।
ঢাকায় সিরডাপে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস)-এর আয়োজনে ‘অর্থনৈতিক শাসন ও দুর্নীতি প্রতিরোধ’ শীর্ষক এক সংলাপে তিনি এসব কথা বলেন। আলোচনায় দেশের চলমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা উঠে আসে।
দুর্নীতি ও শাসনব্যবস্থার সংকট
ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, দুর্নীতি বাংলাদেশে নতুন কোনো সমস্যা নয়; বরং এটি সময়ের সঙ্গে আরও বহুমাত্রিক ও জটিল হয়ে উঠেছে। তার ভাষায়, রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি ও হয়রানি এখন অনেক ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। তিনি মনে করেন, বর্তমান ব্যবস্থায় টেকসই সংস্কারের কোনো শক্ত উদাহরণ এখনো গড়ে ওঠেনি।
তিনি আরও বলেন, সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে এই সংকট আরও গভীর হবে। আমলাতন্ত্রের অতিরিক্ত ক্ষমতাকেও তিনি একটি বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেন।
এলডিসি উত্তরণ ও অর্থনৈতিক প্রস্তুতি
চলতি বছরে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পথে থাকলেও, সে জন্য দেশ কতটা প্রস্তুত—এ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এই অর্থনীতিবিদ। তার মতে, আর্থিক খাতে কিছু সংস্কার উদ্যোগ দেখা গেলেও সেগুলো দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।
তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতি এখনও প্রধানত তৈরি পোশাক শিল্প (আরএমজি) ও রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল। টেকসই উন্নয়নের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন, উদ্ভাবন এবং নতুন খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি।
রাজনীতি, নির্বাচন ও জনগণের প্রত্যাশা
ড. হোসেন জিল্লুর রহমান আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেন। তার মতে, দেশে অগ্রাধিকারভিত্তিক কাজের সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে জনগণ আর কেবল প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না; তারা দৃশ্যমান ও বাস্তব উদ্যোগ দেখতে চায়।
তিনি জানান, প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে উপদেষ্টাদের কাজের অগ্রগতি নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করা হলে তা ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য সহায়ক হতে পারে।
বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও তরুণ সমাজ
আলোচনায় তিনি উল্লেখ করেন, দেশে বিনিয়োগের গতি কমে গেছে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিও প্রত্যাশিত মাত্রায় হচ্ছে না। এর ফলে মেধাবী তরুণদের একটি বড় অংশ দেশের বাইরে সুযোগ খুঁজছে। তার মতে, অতিরিক্ত কেন্দ্রীয়করণ কমিয়ে বিকেন্দ্রীকরণ বাড়ানো সময়ের দাবি।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, শুধু ভালো সরকার থাকলেই দেশ বদলে যাবে না; সঠিক ও টেকসই উন্নয়নের জন্য শক্তিশালী নাগরিক সমাজও প্রয়োজন।
সংলাপে অন্যান্য বক্তাদের বক্তব্য
অনুষ্ঠানে উপস্থিত বক্তারা দুর্নীতি, রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক কাঠামোর সীমাবদ্ধতা নিয়ে মত দেন। বক্তারা কর-জিডিপি অনুপাত কম থাকা, বৈদেশিক বিনিয়োগ হ্রাস এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
আলোচনায় সংসদ সদস্যদের জবাবদিহিতা, স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব এবং রাজনৈতিক সংস্কার নিয়ে বিভিন্ন প্রস্তাব উঠে আসে, যা ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন অংশগ্রহণকারীরা।
Source: Based on reporting from Dhaka Post
