ভেনেজুয়েলায় আগ্রাসন: ট্রাম্পের শান্তি মানে কি তাহলে যুদ্ধ

বিশ্ব ডেস্ক—নতুন বছর শুরু হতেই বিশ্ব রাজনীতিতে উত্তেজনার পারদ চড়েছে। ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক হামলা এবং প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার ঘোষণার মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আবারও প্রশ্ন উঠেছে—ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত ‘শান্তি উদ্যোগ’ কি বাস্তবে আরও সংঘাতের জন্ম দিচ্ছে?

শনিবার ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরে একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা ছিল দৃশ্যত একটি শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের অভিযান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে আনা হয়েছে। এই ঘটনাকে অনেক বিশ্লেষক লাতিন আমেরিকায় নতুন করে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের সূচনা হিসেবে দেখছেন।

ভেনেজুয়েলা ছাড়াও একাধিক দেশে মার্কিন হামলা

ভেনেজুয়েলার ঘটনার আগে বড়দিনে নাইজেরিয়ায় মার্কিন বিমান হামলা, সোমালিয়ায় অঘোষিত অভিযানের খবর এবং সিআইএ ড্রোন ব্যবহারের অনুমোদন—সব মিলিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রথম দিকের দিনগুলোই সংঘাতপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং একটি বিস্তৃত কৌশলগত নীতির অংশ।

ইসরাইল প্রসঙ্গ ও দ্বৈত মানদণ্ডের অভিযোগ

ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখে ট্রাম্প গাজা পরিস্থিতিতে ইসরাইলের অবস্থানকে নিঃশর্ত সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন। যদিও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার তথ্যে দেখা যাচ্ছে, যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন, অবরোধ এবং হামলায় বিপুল সংখ্যক ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

ফিলিস্তিনি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গাজা উপত্যকায় জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে এবং লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। তবুও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইসরাইলের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো চাপ দেখা যাচ্ছে না—যা বিশ্বব্যাপী দ্বৈত মানদণ্ডের অভিযোগকে আরও জোরালো করছে।

আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে বাড়তে থাকা অস্থিরতা

সোমালিল্যান্ডকে ইসরাইলের স্বীকৃতি দেওয়ার ঘটনায় আফ্রিকার হর্ন অঞ্চলেও নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সোমালিয়াসহ বিভিন্ন মুসলিম দেশ তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব পদক্ষেপ শুধু আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকেই নয়, বৈশ্বিক কূটনীতিক কাঠামোকেও দুর্বল করছে।

নতুন ‘মনরো মতবাদ’ ও নব্য-ঔপনিবেশিক কৌশল

বিশ্লেষকদের মতে, ভেনেজুয়েলায় সাম্প্রতিক হামলা যুক্তরাষ্ট্রের নতুন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের প্রতিফলন। এই নীতিতে লাতিন আমেরিকাকে আবারও ওয়াশিংটনের প্রভাববলয়ের অংশ হিসেবে দেখার প্রবণতা স্পষ্ট। ট্রাম্প প্রকাশ্যেই ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ‘অধিকার’ থাকার ইঙ্গিত দিয়েছেন, যা দেশটির দীর্ঘদিনের জাতীয়করণ নীতির সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।

শান্তি উদ্যোগের ভবিষ্যৎ প্রশ্নবিদ্ধ

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ হোক কিংবা গাজা সংকট—ট্রাম্পের তথাকথিত শান্তি প্রচেষ্টা এখনো দৃশ্যমান কোনো সাফল্য দেখাতে পারেনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে এগুলোকে তাৎক্ষণিক, ব্যবসায়িক দরকষাকষির মতো মনে করছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে বৈশ্বিক রাজনীতি পরিচালনার এই প্রবণতা অন্য দেশগুলোকেও একই পথে হাঁটার বৈধতা দিচ্ছে। এর ফলে বহুপাক্ষিকতা দুর্বল হয়ে বিশ্ব আরও অনিশ্চিত ও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে।

উপসংহার

ভেনেজুয়েলার ওপর সাম্প্রতিক হামলা শুধু একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; এটি বৈশ্বিক রাজনীতিতে শক্তির ভারসাম্য, সার্বভৌমত্ব এবং আন্তর্জাতিক আইনের ভবিষ্যৎ নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। ২০২৬ সালের শুরুতেই বিশ্ব যেন আগের চেয়ে আরও অস্থির ও সংঘাতমুখী হয়ে উঠছে।

এই লেখায় প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব।

Next Post Previous Post

Advertisement