১২ ফেব্রুয়ারিই নির্বাচন, একদিন আগেও নয় পরেও নয়
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও সংশ্লিষ্ট গণভোট নির্ধারিত সময়েই অনুষ্ঠিত হবে বলে সরকারের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তার ভাষায়, এই নির্বাচন এক দিন আগেও নয়, এক দিন পরেও নয়—আগামী ১২ ফেব্রুয়ারিতেই অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন ঘিরে দেশি-বিদেশি নানা আলোচনা ও গুঞ্জনের মধ্যেই সরকারের পক্ষ থেকে সময়সূচি নিয়ে এই স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হলো।
মঙ্গলবার রাতে ঢাকার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় যুক্তরাষ্ট্রের দুই সাবেক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক আলবার্ট গম্বিস ও মর্স ট্যানের সঙ্গে বৈঠককালে প্রধান উপদেষ্টা এ কথা বলেন। বৈঠকে নির্বাচন ছাড়াও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, গণতান্ত্রিক উত্তরণ এবং আন্তর্জাতিক উদ্বেগের বিভিন্ন বিষয় উঠে আসে।
নির্বাচন নিয়ে সরকারের অঙ্গীকার
প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই নির্বাচন আয়োজন করতে এবং ফল ঘোষণার পর গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “কে কী বলল, সেটি বিবেচ্য নয়। নির্বাচন ১২ ফেব্রুয়ারিতেই হবে।”
তার দাবি, নির্বাচন হবে অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে। পুরো প্রক্রিয়ায় অন্তর্বর্তী সরকার নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করবে এবং প্রশাসন থাকবে পক্ষপাতমুক্ত। সব রাজনৈতিক দল সমান সুযোগ পাবে বলেও তিনি আশ্বস্ত করেন।
গণভোট ও জুলাই সনদ প্রসঙ্গ
গণভোটের বিষয়ে ড. ইউনূস জানান, সরকার ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তার মতে, জনগণের সমর্থনে জুলাই সনদ অনুমোদিত হলে তা দেশের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে। ভবিষ্যতে স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা ঠেকাতে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক রূপান্তর ও তরুণদের ভূমিকার কথাও আলোচনায় আসে। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, সাম্প্রতিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তরুণ সমাজের রাজনৈতিক সচেতনতা ও অংশগ্রহণ বেড়েছে, যা গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক ইঙ্গিত।
ভুয়া খবর ও বিভ্রান্তি নিয়ে উদ্বেগ
নির্বাচন সামনে রেখে ভুয়া খবর ও অপতথ্য ছড়ানোর চেষ্টা চলছে বলে সতর্ক করেন ড. ইউনূস। তিনি বলেন, কিছু গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে বিভ্রান্তি তৈরি করতে চায়। তবে জনগণ আগের তুলনায় অনেক বেশি সচেতন এবং ক্রমেই এআই-নির্ভর ভুয়া ভিডিও ও তথ্য শনাক্ত করতে পারছে।
এ প্রসঙ্গে সাবেক মার্কিন কূটনীতিক আলবার্ট গম্বিস একমত পোষণ করে বলেন, বিশ্বব্যাপী ভুয়া খবর গণতন্ত্রের বড় শত্রুতে পরিণত হয়েছে। এই হুমকি মোকাবিলায় রাষ্ট্র ও সমাজকে আরও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে বলে তিনি মত দেন।
ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন প্রসঙ্গ
বৈঠকে দক্ষিণ আফ্রিকার অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশে ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন’ উদ্যোগ নেওয়ার সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়। ড. ইউনূস জানান, তিনি নেলসন ম্যান্ডেলার সময়কার এই প্রক্রিয়া নিবিড়ভাবে অনুসরণ করেছেন। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে এমন উদ্যোগ নেওয়ার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি বলে তার মূল্যায়ন।
তার মতে, এ ধরনের উদ্যোগ সফল করতে হলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর ভুল স্বীকার, অনুশোচনা ও আত্মসমালোচনার মানসিকতা প্রয়োজন, যা এখনো দৃশ্যমান নয়।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের নির্বাচন
প্রায় এক ঘণ্টার এই বৈঠকে নির্বাচন ছাড়াও রোহিঙ্গা সংকট, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হয়। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক কূটনীতিকদের সঙ্গে এই বৈঠক আন্তর্জাতিক মহলের কাছে বাংলাদেশের নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি ও অবস্থান স্পষ্ট করার একটি কূটনৈতিক বার্তা বহন করে।
সব মিলিয়ে, সরকারের কঠোর অবস্থান ও সময়সূচি পুনর্ব্যক্তের মাধ্যমে নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এখন নজর থাকবে বাস্তবায়নের দিকে এবং নির্বাচনী পরিবেশ কতটা শান্তিপূর্ণ থাকে, তার ওপর।
Source: Based on reporting from আমার দেশ
