কারওয়ান বাজারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধসহ তদন্তের কেন্দ্রে তিন প্রশ্ন

তেজতুরি বাজারে ‘টার্গেট কিলিং’ : মুসাব্বির হত্যা ঘিরে রাজনৈতিক ও অপরাধ জগতে তোলপাড়

তেজতুরি বাজারে ‘টার্গেট কিলিং’ : মুসাব্বির হত্যা ঘিরে রাজনৈতিক ও অপরাধ জগতে তোলপাড়

🗓️ ঢাকা | অপরাধ ও রাজনীতি ডেস্ক

রাজধানীর তেজতুরি বাজার এলাকায় দুঃসাহসিক ‘কিলিং মিশনে’ ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমান মুসাব্বিরের খুনের ঘটনায় উত্তাল হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক অঙ্গন ও অপরাধ জগৎ।

বৃহস্পতিবার সকালে তেজগাঁও থানায় নিহতের স্ত্রী সুরাইয়া বেগম একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার তদন্তে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, কারওয়ান বাজারকেন্দ্রিক আধিপত্য বিস্তার এবং জেলবন্দি শীর্ষ সন্ত্রাসীর সঙ্গে জমি সংক্রান্ত বিরোধ—এই তিনটি বিষয়কে সমান গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখছে পুলিশ।

গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে কারওয়ান বাজারকেন্দ্রিক এক প্রতিপক্ষ স্থানীয় নেতাকে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তবে এখনো কেউ দায় স্বীকার করেনি। স্বেচ্ছাসেবক দলের পক্ষ থেকে খুনিদের গ্রেপ্তারে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেওয়া হয়েছে এবং শনিবার দেশব্যাপী বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে।

তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে তিনটি বড় প্রশ্ন

প্রথমত, কারওয়ান বাজার এলাকার ব্যবসা ও শ্রমিক সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আধিপত্যের দ্বন্দ্ব। গুলিবিদ্ধ আবু সুফিয়ান মাসুদ ওই এলাকার ভ্যানচালক সমিতির সাধারণ সম্পাদক। পরিবহন ও ব্যবসা খাতে দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব হত্যার পেছনে ভূমিকা রেখেছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

দ্বিতীয়ত, শীর্ষ সন্ত্রাসী সুইডেন আসলামের সম্পৃক্ততার অভিযোগ। বসুন্ধরা সিটির পেছনের একটি মূল্যবান সরকারি জমি নিয়ে বিরোধ ছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে। পেশাদার কায়দায় কয়েক সেকেন্ডে হত্যাকাণ্ড সম্পন্ন হওয়ায় এটি সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের কাজ বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তৃতীয়ত, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা। স্বেচ্ছাসেবক দলের শীর্ষ নেতা হিসেবে মুসাব্বির ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির রাজনীতিতে পরিচিত মুখ ছিলেন এবং আওয়ামী লীগ শাসনামলে দীর্ঘ কারাভোগের ইতিহাস রয়েছে তার।

শেষ কফিটুকুও আর খাওয়া হলো না

নিহতের স্ত্রী সুরাইয়া বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, হত্যাকাণ্ডের কিছুক্ষণ আগে মুসাব্বির তাকে বলেছিলেন—“তুমি একটা কফি বানাও, নামাজ পড়ে এসে খাব।” সেই কফি আর কখনো খাওয়া হয়নি।

তিনি বলেন, “সিসিটিভিতে সব আছে, তবু কেন খুনিরা ধরা পড়ছে না? বিচার না হলে আরও অনেক পরিবার এভাবে ধ্বংস হয়ে যাবে।”

পেশাদার শ্যুটারদের নিখুঁত ‘টার্গেট কিলিং’

প্রত্যক্ষদর্শী ও সিসিটিভি ফুটেজ অনুযায়ী, বুধবার রাত আটটার দিকে হেলমেট পরা দুই শ্যুটার মোটরসাইকেলে এসে মুসাব্বির ও মাসুদকে লক্ষ্য করে অন্তত পাঁচ রাউন্ড গুলি ছোড়ে। মুহূর্তের মধ্যেই তারা ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।

মুসাব্বির ঘটনাস্থলেই গুরুতর আহত হন এবং হাসপাতালে নেওয়ার পর তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। আহত আবু সুফিয়ান মাসুদ বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন।

গোয়েন্দা নজরদারি ও সীমান্ত সতর্কতা

পুলিশ জানিয়েছে, অন্তত এক ডজন সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। শ্যুটাররা যাতে সীমান্ত পার হয়ে পালাতে না পারে, সেজন্য সব স্থলবন্দর ও ইমিগ্রেশন পয়েন্টে বিশেষ সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছে।

ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার ইবনে মিজান বলেন, “সম্ভাব্য সব দিক সামনে রেখে তদন্ত চলছে। খুনিদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।”

জানাজায় আলটিমেটাম

বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় জানাজা শেষে আজিমপুর কবরস্থানে মুসাব্বিরকে দাফন করা হয়। এর আগে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় উপস্থিত নেতাকর্মীরা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে খুনিদের গ্রেপ্তারের দাবি জানান।

Next Post Previous Post

Advertisement