গুলিবিদ্ধ হয়ে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেলেন জুলাই অভ্যুত্থানের অগ্রনায়ক শরিফ ওসমান হাদি

জুলাই অভ্যুত্থানের পরিচিত মুখ ও রাজনৈতিক সংগঠক শরিফ ওসমান হাদি আর নেই। রাজধানীর পল্টনের বিজয়নগর এলাকায় গুলিবিদ্ধ হওয়ার প্রায় এক সপ্তাহ পর বৃহস্পতিবার রাতে সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। চলতি বছরের ৪ সেপ্টেম্বর দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি বলেছিলেন, “মৃত্যুর ফয়সালা জমিনে না, আসমানে হয়।” সেই বক্তব্য নতুন করে আলোচনায় এসেছে তাঁর মৃত্যুর খবরে।

রাজনৈতিক অঙ্গনে সাহসী বক্তৃতা ও প্রতিবাদী অবস্থানের জন্য পরিচিত হাদি ছিলেন ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী। জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে তিনি ধারাবাহিকভাবে রাজপথে সক্রিয় ছিলেন এবং বিভিন্ন আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা ও চিকিৎসা

গত শুক্রবার রাজধানীর পল্টন এলাকার বিজয়নগরে তিনি গুলিবিদ্ধ হন। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ চেষ্টা সত্ত্বেও বৃহস্পতিবার রাতে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুতে রাজনৈতিক অঙ্গন ও সামাজিক মাধ্যমে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

রাজনৈতিক পথচলা ও পরিচিতি

শরিফ ওসমান হাদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ২০১০–২০১১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। ঝালকাঠির নলছিটিতে তাঁর গ্রামের বাড়ি। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকার মাধ্যমে তিনি জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি পান। জুলাই অভ্যুত্থানের পর গঠিত জাতীয় নাগরিক কমিটির সদস্য ছিলেন তিনি, যদিও পরবর্তীতে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) গঠিত হলে সেখানে যোগ দেননি।

পরবর্তী সময়ে তিনি নিজ উদ্যোগে ‘ইনকিলাব মঞ্চ’ নামে একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলেন। আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করা, জুলাইয়ে সহিংসতায় জড়িতদের বিচার এবং অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবিতে এই প্ল্যাটফর্মের ব্যানারে মিছিল, সমাবেশ ও অনশন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। এসব কর্মসূচিতে সামনের সারিতেই থাকতেন হাদি।

বক্তৃতা, অবস্থান ও বিতর্ক

হাদির বক্তৃতা ছিল তীব্র ও আবেগী। তিনি বলতেন, “মৃত্যুর ভয় দেখিয়ে লাভ নেই।” তাঁর অনুসারীরা এসব বক্তব্যকে সাহসের প্রতীক হিসেবে দেখলেও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কাছে তিনি ছিলেন বিতর্কিত চরিত্র। আওয়ামী লীগের সমর্থকদের মধ্যে তাঁর বক্তব্য নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়াও দেখা গেছে।

গত জুলাইয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি বিএনপির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও সমালোচনা করেন এবং অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে একটি জাতীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব দেন।

লেখালেখি ও পেশাগত জীবন

রাজনীতির বাইরে হাদি লেখালেখির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। ‘সীমান্ত শরিফ’ ছদ্মনামে লেখালেখি করতেন তিনি। তাঁর লেখা কবিতার বই ‘লাভায় লালশাক পুবের আকাশ’ প্রকাশিত হয়েছে। তিনি সাইফুরস কোচিং সেন্টারের শিক্ষক ছিলেন এবং সেখান থেকেই তাঁর একটি ইংরেজি বই প্রকাশিত হয়।

নিরাপত্তা শঙ্কা ও শেষ বার্তা

গত নভেম্বরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে হাদি দাবি করেছিলেন, দেশি-বিদেশি অন্তত ৩০টি নম্বর থেকে তিনি হত্যার হুমকি পেয়েছেন। তবুও তিনি লিখেছিলেন, জীবননাশের আশঙ্কা থাকলেও ‘ইনসাফের লড়াই’ থেকে তিনি পিছিয়ে যাবেন না।

তার মৃত্যু জুলাই অভ্যুত্থানের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের ইতি টানল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সমর্থকদের ভাষায়, তিনি ছিলেন আন্দোলনের প্রতীক; আর সমালোচকদের মতে, তিনি ছিলেন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু।

Source: Based on reporting from দৈনিক আমার দেশ

```
Next Post Previous Post

Advertisement