বিএনপি-জামায়াতের বিদ্রোহীদের নিয়ে এনসিপির ‘নতুন সমীকরণ’
ভোটের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের পেশিশক্তি ও অর্থনির্ভর সংস্কৃতি ভাঙার লক্ষ্য নিয়ে ‘শাপলাকলি’ প্রতীকে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের পথে হাঁটছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। শুধু জুলাই অভ্যুত্থানের সামনের সারির নেতাদের নয়, বরং বিএনপি ও জামায়াতসহ বড় রাজনৈতিক দলগুলোর বঞ্চিত কিন্তু জনসম্পৃক্ত সংস্কারপন্থী নেতাদের যুক্ত করে একটি বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলার কৌশল নিয়েছে দলটি।
বিদ্রোহী ও সংস্কারপন্থীদের জন্য দরজা খোলা
এনসিপি সূত্রে জানা গেছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপে প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করতে যাচ্ছে দলটি। প্রথম ধাপে ১২৫ জন প্রার্থীর মনোনয়ন নিশ্চিত করার পর দ্বিতীয় ধাপে বড় ধরনের চমক দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
দলটির একাধিক কেন্দ্রীয় নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিএনপি ও জামায়াতের যেসব বিদ্রোহী নেতা সংস্কার ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, তাদের জন্য এনসিপির মনোনয়ন পাওয়ার সুযোগ উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে জুলাই অভ্যুত্থানের নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিরা অগ্রাধিকার পেলেও পরবর্তী ধাপে দলের বাইরের প্রার্থীরাও মনোনয়ন পেতে পারেন।
৩০০ আসনে প্রার্থী দেওয়ার লক্ষ্য
আসন্ন নির্বাচনে ৩০০ আসনে প্রার্থী দেওয়ার লক্ষ্যে ইতোমধ্যে এনসিপি এক হাজার ৪৮৪টি মনোনয়ন ফরম বিক্রি করেছে। প্রতিটি আসনে গড়ে পাঁচজন করে প্রার্থী মনোনয়ন প্রত্যাশী রয়েছেন। পাশাপাশি একটি রাজনৈতিক জোটও গঠন করেছে দলটি।
দলীয় সূত্র জানায়, প্রথম তালিকায় থাকা কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনৈতিক কর্মকাণ্ড বা বিতর্কিত ভূমিকার অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার মনোনয়ন বাতিল করা হবে। দলের ভাবমূর্তি রক্ষা ও ভোটারদের আস্থা অর্জনকে এই সিদ্ধান্তের মূল লক্ষ্য হিসেবে দেখছে এনসিপি।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর বক্তব্য
এ বিষয়ে এনসিপির প্রধান সমন্বয়কারী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, “প্রথম তালিকায় আমরা মূলত তাদের অন্তর্ভুক্ত করেছি, যারা বিপ্লবী চেতনা ধারণ করেন এবং নতুন সংবিধানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। সবাইকে প্রথম তালিকায় রাখা সম্ভব হয়নি। দ্বিতীয় ধাপে বিএনপি ও জামায়াতের সংস্কারপন্থী বিদ্রোহীদের মনোনয়ন দেওয়া হবে।”
তিনি আরও বলেন, “যারা টাকার রাজনীতিতে হেরে গেছেন কিন্তু জনগণের সঙ্গে সুসম্পর্ক রয়েছে এবং সংসদে প্রতিনিধিত্ব করতে চান— তাদের জন্য এনসিপির দরজা খোলা।”
জোটের স্বার্থে আসন ছাড়তেও প্রস্তুত
নতুন রাজনৈতিক জোট ‘গণতান্ত্রিক সংস্কার জোট’-কে শক্তিশালী করতে প্রয়োজনে নিজেদের শক্ত অবস্থানের আসনও ছাড়তে প্রস্তুত এনসিপি। এই জোটে এনসিপির পাশাপাশি রয়েছে আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) এবং রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন।
দলটির নেতারা বলছেন, এটি কোনো সাময়িক নির্বাচনী সমঝোতা নয়; বরং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, রাষ্ট্র সংস্কার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার একটি দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ। আদর্শিক ঐক্য, মাঠপর্যায়ের শক্তি ও জনআস্থার ভিত্তিতেই আসন সমঝোতা করা হবে।
আচরণবিধি লঙ্ঘনে ‘জিরো টলারেন্স’
নির্বাচনী আচরণবিধি ও আর্থিক নীতিমালা পালনের বিষয়ে এনসিপি কঠোর অবস্থান নিয়েছে। পোস্টার, ব্যানার ব্যবহার বা নির্ধারিত ব্যয়সীমা লঙ্ঘন করলে প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিলসহ কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।
গত ১০ ডিসেম্বর রাজধানীর বাংলামোটরে এক সংবাদ সম্মেলনে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, “নির্বাচন কমিশনের সব নীতিমালা অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হবে। শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতার প্রশ্নে কোনো আপস করা হবে না।”
দ্বিতীয় তালিকায় থাকছে চমক
এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্য সচিব এএসএম সুজা উদ্দিন বলেন, দ্বিতীয় ধাপে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থেকে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা এনসিপির মনোনয়ন পেতে পারেন। যাচাই-বাছাই শেষে খুব শিগগিরই বাকি তালিকা প্রকাশ করা হবে।
দলীয় সূত্র আরও জানায়, হাদি ইস্যুর কারণে সদ্য পদত্যাগ করা দুই ছাত্র উপদেষ্টার এনসিপিতে যোগদান কিছুটা পিছিয়েছে। তবে তারা যোগ দিলে দলীয় মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে, বিদ্রোহী ও সংস্কারপন্থী নেতাদের যুক্ত করে এনসিপি যে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করতে চাইছে, তা আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
