ফারাক্কা ব্যারাজের ৫০ বছর: পদ্মা ও শাখা নদীর অস্তিত্ব সংকটে, বাংলাদেশে ক্ষোভ অব্যাহত
ফারাক্কা ব্যারাজ চালুর ৫০ বছর পূর্ণ হলো। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে গঙ্গা নদীর উপর নির্মিত এ বাঁধের প্রভাব বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি, নদীপ্রবাহ ও পরিবেশে ফেলেছে সুদূরপ্রসারী ছাপ। পদ্মা নদীর প্রবাহ হ্রাস, নদ-নদীর শুকিয়ে যাওয়া, জীববৈচিত্র্য ও কৃষিভিত্তিক জীবিকা বিপন্ন হওয়ায় এ ব্যারাজ নিয়ে বাংলাদেশে বহু দশক ধরে উদ্বেগ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে।
১৯৭৫ সালে চালু হওয়া ফারাক্কা ব্যারাজের মূল উদ্দেশ্য ছিল হুগলি নদীতে নাব্যতা বজায় রাখা। তবে সেই উদ্দেশ্য পূরণ করতে গিয়ে গঙ্গার পানির একটি বৃহৎ অংশ ফারাক্কা পয়েন্ট থেকে পশ্চিমবঙ্গে সরিয়ে নেওয়া হয়, যার ফলাফল বাংলাদেশে বহুমাত্রিক বিরূপ প্রভাব।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ার কারণে পদ্মা নদীর মূলপ্রবাহ সংকুচিত হয়েছে। নদীর তলদেশে ব্যাপক হারে চর জেগেছে, যা একদিকে নদীর নাব্যতা হ্রাস করেছে, অন্যদিকে বর্ষা মৌসুমে বন্যার তীব্রতা বাড়িয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাইড্রোলজি ও হাইড্রোইনফরমেটিকস বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান বলেন, “ফারাক্কার প্রভাবে শুধু পদ্মা নয়, এর সঙ্গে যুক্ত অনেক শাখা নদী যেমন মরা গেছে তেমনি নদী কেন্দ্রিক জীববৈচিত্র্যও বিলুপ্তির পথে। এটি শুধু পরিবেশগত ইস্যু নয়, এটি আমাদের খাদ্যনিরাপত্তা ও জাতীয় অর্থনীতির সঙ্গেও সম্পৃক্ত।”
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ দশকে পদ্মার উৎসে পানিপ্রবাহ ৬০ শতাংশের বেশি কমে গেছে। এর ফলে পদ্মা বেষ্টিত অঞ্চলগুলোতে কৃষি উৎপাদন হ্রাস, নদীভাঙন, এবং জনবসতির স্থানান্তর হয়েছে।
বিভিন্ন সময় বাংলাদেশ সরকার ফারাক্কা ইস্যুতে ভারতের সঙ্গে আলোচনায় বসেছে। ১৯৯৬ সালে দুই দেশের মধ্যে ৩০ বছরের জন্য গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তবে বাস্তবায়ন পর্যায়ে পানি সরবরাহে অনিয়ম ও স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে বাংলাদেশ একাধিকবার উদ্বেগ জানিয়েছে।
সাবেক পানিসম্পদ সচিব মিজানুর রহমান বলেন, “এই চুক্তি থাকা সত্ত্বেও শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ আশানুরূপ থাকে না। ভারত একতরফাভাবে পানিপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করছে, যা আন্তর্জাতিক নদী আইন অনুযায়ী গ্রহণযোগ্য নয়।”
এদিকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের কিছু অংশেও স্থানীয় জনগোষ্ঠী ফারাক্কার বিরোধিতা করেছে, বিশেষত নদীভাঙন ও বন্যার কারণে কৃষির ক্ষতি এবং জেলেদের জীবিকা হারানোর কারণে।
ফারাক্কা ব্যারাজের ৫০ বছর পূর্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ, যা ভবিষ্যতের জন্য নতুন চিন্তার দরজা খুলে দিতে পারে। আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনার ন্যায্যতা, টেকসই পানি বণ্টন এবং প্রতিবেশভিত্তিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে দুই প্রতিবেশী দেশের আরও স্বচ্ছ, বৈজ্ঞানিক এবং সহযোগিতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। পদ্মা নদীসহ বাংলাদেশের নদ-নদীগুলোর অস্তিত্ব রক্ষা কেবল একটি পরিবেশগত বা রাজনৈতিক ইস্যু নয়—এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের টিকে থাকার প্রশ্ন।
