মাজারের পুকুরে ফিরতে ছটফট করছে কুমিরটি, ১৯ দিন কিছু খায়নি

বাগেরহাটের খানজাহান আলী মাজারের দীঘি থেকে উদ্ধার করা কুমিরটি ১৯ দিন ধরে কোনো খাবার গ্রহণ করেনি। বর্তমানে খুলনার বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে থাকা এই কুমিরটি পরিচিত পরিবেশে ফিরতে ছটফট করছে বলে জানিয়েছে বন বিভাগ।

বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের খুলনা বিভাগীয় কর্মকর্তা নির্মল কুমার পাল জানিয়েছেন, মানুষ ও কুমির—দুই পক্ষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে কুমিরটিকে আবারও মাজারের দীঘিতে ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।

ঘটনার পর দীঘি থেকে সরানো হয় কুমিরটি

গত ১ জুন সন্ধ্যায় বাগেরহাটের খানজাহান আলী মাজারের দীঘিতে ফাতেমা নামের এক শিশুকে কুমির টেনে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ ওঠে। পরদিন ভোরে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনার পর স্থানীয়দের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হলে মাজার কমিটি কুমিরটি সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

প্রশাসনের অনুরোধে বন বিভাগের সদস্যরা দীর্ঘ চেষ্টার পর ৩ জুন কুমিরটিকে ধরে খুলনার রেসকিউ সেন্টারে নিয়ে যান। এরপর থেকে নতুন পরিবেশে থাকলেও কুমিরটি খাবার গ্রহণ করছে না।

কেন খাবার খাচ্ছে না কুমির?

নির্মল কুমার পাল বলেন, সরীসৃপ প্রাণীর খাদ্য গ্রহণের ধরন মানুষের মতো নয়। এদের শরীরের তাপমাত্রা খাবার থেকে নয়, বরং পরিবেশের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। তাই দীর্ঘ সময় খাবার ছাড়া থাকলেও অনেক সময় তাদের বড় ধরনের সমস্যা হয় না।

তিনি জানান, এর আগেও রেসকিউ সেন্টারে থাকা কয়েকটি কুমির দীর্ঘ সময় খাবার গ্রহণ করেনি। বর্তমানে থাকা এই কুমিরটির ক্ষেত্রেও বিষয়টি অস্বাভাবিক নয় বলে মনে করছে বন বিভাগ।

দীঘিতে ফেরানোর শর্ত

বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মাজার কমিটি যদি আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করে জানায়, তাহলে কুমিরটিকে আবার দীঘিতে ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।

তবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কুমিরটিকে অন্য কোনো সংরক্ষিত স্থানে স্থানান্তর করা হতে পারে।

বিশাল আকৃতির এই কুমিরের বয়স প্রায় ৫০ বছর

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মিঠা পানির এই কুমিরটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৭ থেকে ৮ ফুট এবং ওজন আনুমানিক ৫০০ থেকে ৬০০ কেজি। বয়স প্রায় ৫০ বছর। অতিরিক্ত ওজনের কারণে কুমিরটির কিছু শারীরিক জটিলতাও রয়েছে।

বর্তমানে এটি পানিতে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারলেও স্থলে বেশি হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে। পরিচিত পরিবেশে ফেরার আকাঙ্ক্ষায় এটি অনেক সময় খাঁচার গেটে গিয়ে ধাক্কা দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষ যত্নে রাখা হয়েছে কুমিরটি

রেসকিউ সেন্টারে কুমিরটির জন্য বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নিয়মিত পানি পরিবর্তন করা হচ্ছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী শরীরে পানি ছিটিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

খাবার হিসেবে মুরগি ও হাঁস দেওয়া হলেও কুমিরটি তা গ্রহণ করেনি। এমনকি শিকার করলেও খাবার হিসেবে গ্রহণ করছে না বলে জানিয়েছে বন বিভাগ।

খানজাহান আলী মাজারের ঐতিহ্যের অংশ

খানজাহান আলী মাজারের দীঘির কুমিরগুলো দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় মানুষের কাছে পরিচিত ছিল। আগে এখানে ‘কালাপাহাড়’ ও ‘ধলাপাহাড়’ নামে দুটি বিখ্যাত কুমির ছিল। সেগুলো মারা যাওয়ার পর ভারত থেকে কয়েকটি মিঠা পানির কুমির এনে দীঘিতে ছাড়া হয়।

পরবর্তীতে বিভিন্ন কারণে কয়েকটি কুমির মারা গেলে বর্তমানে থাকা কুমিরটিই ছিল দীঘির শেষ কুমির।

শেষ কথা

কুমিরটির ভবিষ্যৎ এখন নির্ভর করছে মানুষের নিরাপত্তা ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য তৈরির ওপর। বন বিভাগ বলছে, মানুষের জীবন রক্ষা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি একটি বন্যপ্রাণীর নিরাপদ সংরক্ষণও তাদের দায়িত্ব।

Source attribution: Source: Based on reporting from বাংলা ট্রিবিউন ও বন বিভাগের তথ্য

Next News Previous News